----- জসিম
উদ্দিন
তখন
শীতকাল। কোথাও আম পাওয়া যায়
না। উজির জোড়হাতে কুর্নিশ করিতে করিতে বলিল, “বাদশা নামদার! আলস্পনা! জাহাপনা! বান্দার গােস্তাকি মাফ করুন, এটা শীতকাল। এখন আম পাকে না।
সুতরাং আম খাইতে হইলে
জাহাপনাকে জ্যৈষ্ঠমাস পর্যন্ত অপেক্ষা করিতে হইবে।”
উজিরের
কথা শুনিয়া বাদশা গােস্বায় জ্বলিয়া উঠিলেন। কি, এতবড় দেশের বাদশা তিনি! যাহার হুকুমে বাঘে-গরুতে একঘাটে পানি খায় ; তাঁহাকে কিনা একটি সামান্য আম খাইতে জ্যৈষ্ঠমাস
পর্যন্ত অপেক্ষা করিতে হইবে! বাদশা আদেশ করিলেন,
“দেখরে
উজির! তুমি জানিয়া জান না,
সাত
দিবসের মধ্যে যদি তুমি আম না।
খাওয়াইতে
পার।
তবে
তােমার কাটিবে গর্দানা।"
শুনিয়া
উজির ভয়ে কাঁপিতে লাগিল। কিন্তু হাকিম নড়ে ত হুকুম নড়ে
না। বাদশার আদেশ নাকচ হইবার নয়।
উজির
ঘুমায় না- খায় না, নায় না, দিন ভরিয়া চিন্তা করে, রাত ভরিয়া চিন্তা করে, কি করিয়া বাদশাকে
আম খাওয়ানাে যায়। উজির এ বনে যায়,-
ও বনে যায়, সারি সারি আম গাছ। তার
পাতার আড়ালে কোথাও একটি আম দেখিতে পায়
না। আর পাইবে কি!
অসময়ে কি আমগাছে আম
ধরে ? মাঝে মাঝে আমগাছ হইতে এক একটি শুকনা
পাতা ঝরিয়া পড়িয়া উজিরকে উপহাস করিতে থাকে। | ভাবিতে ভাবিতে একদিন উজিরের মনে একটি বুদ্ধি আসিল। সাতদিন গত হইলে সকালে
উজির কিছু তেঁতুলের রস আর চিটাগুড়
একত্র করিয়া তার সমস্ত দাড়িতে মাখাইল। তারপর যথাসময়ে বাদশার দরবারে যাইয়া উপস্থিত হইল।
দরবারের
সমস্ত কাজ রাখিয়া বাদশা জিজ্ঞাসা করিলেন, “দেখরে উজির! তুমি সেই আম্রফলের খোঁজ পাইয়াছ?”
উজির
হাতজোড় করিয়া বলিল, “খােদাবন্দ আলম্পনা! জাহাপনা! বান্দার গােস্তাকি মাফ করিবেন! এই অসময়ে আমি
জাহাপনাকে সত্যকার আম খাওয়াইতে পারিব
না। কিন্তু আমের যে কিরূপ স্বাদ,
আপনাকে তাহা অনুভব করাইতে পারি। আপনি আমার এই দাড়িতে জিহ্বা
লাগাইয়া দেখুন, আপনি আমের স্বাদ পাইবেন।"
এই
বলিয়া উজির বাদশার সামনে যাইয়া, তাহার দাড়ি আগাইয়া ধরিল। বাদশা উজিরের দাড়িতে জিহ্বা লাগাইয়া বলিলেন, “চমৎকার ! তােফা-তােফা!” | তখন সভাসদেরা জিজ্ঞাসা করিল, “বাদশা নামদার! উজিরসাহেবের দাড়িতে জিহ্বা লাগাইয়া আপনি কি বুঝিলেন ?"
বাদশা
সহাস্যে বলিলেন, “আমি বুঝিলাম, আম খাইতে সামান্য
টক=মিশানাে মিষ্টি, আর কিঞ্চিৎ আঁশযুক্ত।"
উজির
হাতজোড় করিয়া বলিলেন, “জহাপণা সত্যই অনুভব করিয়াছেন।”
সে
যাত্রা উজিরের গর্দান রক্ষা পাইল । উজিরের এই
উপস্থিত | বুদ্ধি দেখিয়া বাদশা তাহাকে একজাহার টাকা ইনাম দিলেন।
সমাপ্ত
No comments:
Post a Comment