[গল্পটি ২য় বিশ্বযুদ্ধের বাস্তব ঘটনার আলোকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের একজন যুদ্ধার লেখা]
--মিখাইল
শলােখভ
যুদ্ধের
পর দনের উজান অঞ্চলের প্রথম বসন্তটা এসেছিল। হহ করে উদ্দাম
হয়ে। মার্চের শেষে আজভ সাগরের এলাকা থেকে উষ্ণ বাতাস বইতে শুরু করে, দুদিনের মধ্যেই দনের বা তীরের বরফ
গলে বেরিয়ে পড়ে বালি, স্তেপের তুষারকণায় ঠাসা খালখন্দগলে ফেপে ওঠে আর বরফ ভেঙে
পাগলার মতাে ভুটতে থাকে স্তেপের ঝােরাগুলাে, রাস্তাঘাট প্রায় একেবারে দুর্গম হয়ে ওঠে। অচল পথের এই দুর্যোগের সময়টায়
আমায় যেতে হয়েছিল বকানভায়া গ্রামে। দর বেশি নয়
– মাত্র ষাট কিলােমিটারের মতাে, কিন্তু সেটা পাড়ি দেওয়া খুব সহজ মনে হল না। সঙ্গীকে
নিয়ে যাত্রা করেছিলাম সুর্যোদয়ের আগে। পুষ্ট একজোড়া ঘােড়ার প্রাণপণ টানেও ভারি গাড়িটা কোনােক্রমে এগােচ্ছিল। তুষারকণা আর বরফে মাখা
ভেজা বালির মধ্যে প্রায় দেবে যাচ্ছিল চাকাগুলাে, এক ঘণ্টার মধ্যেই
ঘােড়র গায়ে সর, বেল্ট লাগামের নিচে শাদা শাদা ফেনায়িত গাজলা দেখা গেল, সকালের তাজা বাতাস ভরে উঠল ঘােড়র ঘাম আর ঢালাও করে
আলকাতরা দেওয়া জোয়ালের তীর মদির গন্ধে।
যেখানে
ঘােড়ার পক্ষে বিশেষ রকমের কঠিন হচ্ছিল সেখানে আমরা গাড়ি থেকে নেমে হেটে যাচ্ছিলাম। হাইটের তলায় প্যাচপ্যাচ করছিল কাদাটে বরফ, যাওয়া কঠিন হচ্ছিল, কিন্তু রাস্তার দুপাশ তখনাে রােদ্দুরে ফটিক-দীপ্ত বরফে ঢাকা, সেখান দিয়ে যাওয়া আরাে মুশকিল। ঘণ্টা দুয়েক পরেই মাত্র তিরিশ কিলােমিটার পাড়ি দিয়ে ইয়েলাঙ্কা নদীর খেয়াঘাটে পৌছন গেল।
মখােভকি
গাঁয়ের সামনে ছােটো এই নদীটা গরমের
সময় জায়গায় জায়গায় শুকিয়ে গেলেও এখন অ্যালডার ঝােপে ভরা। নিচু জায়গাটা পুরাে কিলােমিটার পর্যন্ত প্লাবিত করেছে। খেয়া পাড়ি দিতে হল একটা চ্যাপটা
মতাে ছ্যাদাওয়ালা ডিঙিতে, তাতে তিনজনের বেশি লােক ওঠা চলে না।
ঘােড়াগুলােকে
আমরা ছেড়ে দিলাম। ওপারে কলখােজের চালায় একটা পুরননা তােবড়ানাে চেহারার জিপ অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য। চালাতে ওটা পড়ে আছে সেই শীত থেকেই। ড্রাইভারকে নিয়ে খানিকটা ভয়ে ভয়েই নড়বড়ে নৌকাটায় চাপা গেল। জিনিসপত্র নিয়ে এ পারেই রয়ে
গেল আমার সঙ্গী। ঠেলা দিতে না দিতেই পচা
তক্তার নানা জায়গা, থেকে ফোয়ারার মতাে জল উঠল। হাতের
কাছে যা পাওয়া গেল
তাই দিয়েই অনির্ভর তরণীটির ফুটো বন্ধ করে নাপৌছনাে পর্যন্ত অবিরাম জল চেছে ফেলতে
হল। এক ঘণ্টা পরে
ইয়েলাঙ্কার অপর তীরে পৌছলাম। ড্রাইভার গা থেকে জিপটা
বার করে আনলে তারপর নৌকার কাছে গিয়ে দাঁড় টেনে নিয়ে বললে:
হতচ্ছাড়া
গামলাটা যদি জলে তলিয়ে না যায় তাহলে
ঘণ্টা দুয়েক পরে ফিরব, তার আগে আশা নেই। | গ্রামটা বেশ খানিকটা দূরে, নদীর কাছটায় তেমনি নিঝুম, যা দেখা যায়
কেবল নির্জন এলাকায় গভীর হেমন্তে ও বসন্তের একেবারে
গােড়ায়। জল থেকে আসছিল
পচা অ্যালডারের ঝাঝালাে সোঁদা গন্ধ, আর কুয়াসার বেগুনি
ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন পরের প্রিখখাপেক্ষি স্তেপ থেকে হালকা হাওয়ায় ভেসে আসছিল তুষার তল থেকে সদ্য
উন্থাটিত মাটির চির তরণ, আবছা সুবাস।
নদীর
বালুময় তীরের অল্প দূরে একটা ভূপতিত বেড়া; তার ওপর বসে ভাবলাম সিগারেট খাওয়া যাক, কিন্তু কোর্তার
ডান
পকেটে হাত ঢুকিয়ে সখেদে আবিষ্কার করলাম যে, “বেলােমাের” সিগারেটের প্যাকেটটা একেবারে ভিজে গেছে। খেয়া পাড়ির সময় নিচু নৌকাটার ওপর দিয়ে ঢেউ ছিটকে কোমর পর্যন্ত আমায় ভিজিয়ে দিয়ে গেছে ঘােলা জলে। তখন। সিগারেটের কথা ভাবার সময় ছিল না, নৌকাটা যাতে না ডােবে তার
জন্যে চটপট জল চেছে ফেলার
কাজে লেগে পড়তে হয়েছিল আর এখন নিজের
অসতর্কতার জন্যে ভয়ানক খেদ নিয়ে জ্যাবজেবে প্যাকেটটা সযত্নে বার করে উবু হয়ে বসে। স্যাঁৎসেতে, বাদামী হয়ে আসা সিগারেটগুলাে একের পর এক বেড়াটার
ওপর বিছাতে লাগলাম।
সময়টা
দুপুর। মে মাসের মতাে
গরম রােদ্দর। আশা হল সিগারেটগুলাে শীগগিরই
শুকিয়ে যাবে। সুর্য এতই তপ্ত যে বালাপপাশের ফৌজী
প্যান্ট আর কোর্তা পরে
পথে বেরিয়েছি বলে আফসােস হচ্ছিল। শীতের পর সত্যিকারের গরম
দিন এই প্রথম। বেড়াটার
ওপর ঠিক এই ভাবেই, একা
একা নৈঃশব্দ্যে ও নিঃসঙ্গতায় একেবারে
আচ্ছন্ন হয়ে বসে, শ্রমসাধ্য দড়ি বাইবার পর মাথা থেকে
পুরনাে ফৌজী টুপিটা খুলে ভেজা চুলগুলাে বাতাসে শুকিয়ে নিতে নিতে ফিকে নীলের ওপর শাদা শাদা, ভরন্ত-বুক মেঘগুলাের ভেসে যাওয়া আনমনে দেখে যেতে ভালােই লাগছিল।
শীগগিরই
চোখে পড়ল গাঁয়ের শেষ বাড়িগুলাের পেছন থেকে বেরিয়ে এল একটি লােক।
একটা ছেলের হাত ধরে নিয়ে আসছে - দেখে মনে হয় বছর পাঁচ ছয় বয়স, বেশি নয়।
ক্লান্ত
পায়ে তারা যাচ্ছিল খেয়াঘাটটার দিকে, কিন্তু জিপ গাড়িটার কাছাকাছি এসে আমার দিকে ফিরল। লম্বা কোলকুজো লােকটা সােজাসুজি আমার কাছে এসে মােটা ফ্যাশফেশে গলায় বললে;
কুশল ভায়া!
কুশল
হােক এগিয়ে দেওয়া মস্ত খসখসে রুক্ষ হাতটায় চাপ দিলাম।
ছেলেটার
দিকে নয়ে লােকটা বললে :
‘কাকুকে
নমস্কার কর বেটা। দেখছি
তাের বাপের মতােই ড্রাইভার। তবে আমরা চালাতাম লরি, আর ও চালায়
এই ক্ষুদে গাড়িটা।
আকাশটার
মতােই স্বচ্ছ চোখে সােজা আমার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে ছেলেটা তার ঠাণ্ডা গােলাপী হাতখানা নির্ভয়ে বাড়িয়ে দিলে। আদর করে হাতে ঝাঁকি দিয়ে বললাম :
'সে
কি রে বড়াে, এমন
ঠাণ্ডা হাত যে। চারদিকে কেমন গরম আর তুই কিনা
ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছিস?
ভারি
একটা মর্মস্পর্শী ছেলেমানুষী নির্ভরতায় ছেলেটা আমার কোলের কাছ ঘেষে এসে অবাক হয়ে তার পাঁশটে ভুর তুললে: বা
রে, বুড়াে নাকি আমি? আমি তাে ছােটো ছেলে কাকু, আর মােটেই জমে
যাইনি, হাত ঠাণ্ডা - বরফের গােলা পাকাচ্ছিলাম যে। পিঠ থেকে শীর্ণ থলেটা নামিয়ে ক্লান্তভাবে আমার পাশে বসে বাপ বললে :
‘আমার
এই প্যাসেঞ্জারটি নিয়ে যা ভােগান্তি! আমায়
একেবারে হয়রান করে ছেড়েছে। আমি একটু লম্বা লম্বা পা ফেলতে না
ফেলতেই ওর ততক্ষণে দৌড়
শুরু হয়েছে; এমন পদাতিকের সঙ্গে তাল রেখে দেখাে একবার। যেখানে এক পা ফেললে
হয়, সেখানে আমায় হাঁটতে হচ্ছে তিন পা করে। এই
করেই চলেছি ওকে নিয়ে, সেই ঘােড়া আর কাছিমের মতাে।
তাতে আবার রাখতে হচ্ছে একেবারে চোখে চোখে। একটু নজর
রাখলেই
অমনি দেখি কি, কোথায় জলের মধ্যে ছপছপ শর করেছে নয়ত
বরফ ভেঙে লজেন্সের মতাে চুষছে। না, এমন প্যাসেঞ্জারকে নিয়ে কোথাও যাওয়া পুরুষের কম্ম নয় – তাতে আবার পায়ে হেটে। কিছুক্ষণ চুপ করল ও, তারপর শুধাল,
“আর তুমি কি ভায়া, কর্তর
জন্যে বসে আছ বুঝি ?
আমি
ড্রাইভার ওর এই বিশ্বাসটা
ভেঙে দিতে সঙ্কোচ হল। বললাম :
“কী
আর করি।। ওপার থেকে আসছে বুঝি। ‘হ্যাঁ। “তা নৌকাটা আসবে
কখন ? ‘ঘণ্টা দুয়েক লাগবে।
"অনেক সময়।
তবে আর কি, জিরিয়ে
নেওয়া যাক খানিক। তাড়াহুড়াের কিছু নেই। পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, দেখি দলের লােক, ড্রাইভার, খােদার খেসারত গুনছে। ভাবলাম, যাওয়াই যাক, দুজনে তামাক খাওয়া যাবে। একা একা তােমার। তামাক খেতেও ভালাে লাগে না, মরতেও ভালাে লাগে না। তুমি ভায়া দেখছি বেশ ভালােই আছ, প্যাকেটের সিগারেট খাও। ভিজে গেছে মনে হচ্ছে? কথায় বলে জলপড়া তামাক আর রােগে পড়া
ঘােড়া – কোনাে কাজেই লাগে না। তা এসাে, আমার
এই ঘরােয়া দা-কাটা তামাকই
বরং টানা যাক।
সতী
কাপড়ের ফৌজী ট্রাউজারের পকেট থেকে নলের মতাে করে পাকানাে লালচে রঙের রেশমী তামাকদানি বার করে খুলতে লাগল সে, সেই ফাঁকে চোখে পড়ল কোণে লেখা আছে: “প্রিয় সৈনিকের জন্য লেবেদিয়ান মাধ্যমিক স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রীর উপহার।”
ঘরােয়া
বাগানের কড়া তামাক টেনে আমরা অনেকক্ষণ চুপ করে রইলাম। ইচ্ছে হয়েছিল জিজ্ঞেস করি বাচ্চাটাকে নিয়ে সে যাচ্ছে কোথায়,
এমন বিচ্ছিরি পথঘাটে সে বেরিয়েছে কিসের
প্রয়ােজনে, কিন্তু ওই প্রশ্ন শুরু
করল আমার আগে:
‘তা
গােটা লড়াইটা ওই স্টিয়ারিং হইলেই
কাটিয়েছ বুঝি?”
প্রায়
ফ্রন্টে ?”
তা
আমাকেও ভায়া ধকল সইতে হয়েছে কম নয়। হাঁটুর
ওপর বড়াে বড়াে কালচে হাত রেখে সে একটু কুজো
হয়ে বসল। পাশ থেকে তাকিয়ে দেখলাম ওর দিকে, ভেতরে
ভেতরে কেমন একটা অস্বস্তি বােধ হল ... এমন চোখ কখনাে দেখেছেন কি, যে চোখ ঠিক
যেন ছাই মাখা, এমন একটা বিদীর্ণ মত্যু-আতিতে ভরা যে তাকানাে যায়
না? আমার এই হঠাৎ-দেখা
আলাপীটির চোখ ছিল ঠিক সেই রকম।
| বেড়াটা
থেকে একটা শুকনাে বাঁকাট্যারা কাঠি ভেঙে সে মিনিটখানেক চুপ
করে থেকে বালির ওপর তাই দিয়ে কী সব জটিল
আঁকিবুকি কাটতে লাগল, তারপর বললে ;
মাঝে
মাঝে রাতে ঘুম আসে না, শন্যি আঁধারে চোখ মেলে ভাবি: “জীবন আমায় তুই এমন করে মারলি কেন, এমন করে কাটলি কেন?” এর আর জবাব
পাই না, অন্ধকারেও না, ঝলমলে রােদেও না ... জবাব পাইনি, আর পাবােও না!'
হঠাৎ আত্মসংবরণ করলে সে, আদর করে ছেলেটিকে ঠেলা দিয়ে বললে, “যা না, জলের
ধারে খানিকটা খেল গে, বড়াে দরিয়া হলে ছেলেপুলেরা সবসময় কিছু না কিছু একটা
খুজে বার করে। তবে দেখিস, পা ভেজাস না।
চুপচাপ
যখন আমরা ধুমপান করছিলাম, তখনই আমি বাপ ছেলের দিকে চকিতে তাকিয়ে নজর করেছিলাম, অদ্ভুত একটা ব্যাপার দেখে অবাক লেগেছিল। ছেলেটার সাজপােষাক মামুলী, কিন্তু টেকসই; পরনাে ভেড়ার লােমের লাইনিং দেওয়া তার মানানসই লম্বাটে কোটটি, পশমী মােজার সঙ্গে পরবার মতাে করে বানানাে তার ছােট হাইবুটজোড়া, জামার হাতার কবেকার একটা ছেড়া জায়গা নিপুণ করে সেলাই করা -- এ সবকিছুই কোনাে
নারীর দৃষ্টি, মায়ের নিপুণ হাতের চিহু বহন করছিল। কিন্তু বাপের চেহারাটা অন্যরকম : জায়গায় জায়গায় পড়ে যাওয়া বালাপােশের কোর্তাটা যেমন তেমন করে বদখৎ রিপ করা, তার জীর্ণ সতী কাপড়ের ব্রাউজারের ওপর তালিটা ঠিকমতাে মারা হয়নি, পরষালী হাতের বড়াে বড়াে ফোঁড় দেওয়া ; পায়ে প্রায় নতুন একজোড়া ফৌজী বটে, কিন্তু মােটা পশমী মােজাজোড়া ফুটোয় ভর্তি, কোনাে নারীর হাত তীতে পড়েনি ... তখনই মনে হয়েছিল; হয় বিপত্নীক, নয়ত বৌয়ের সঙ্গে মিলমিশ নেই।”
ছেলেটির
গমন পথের দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে রইল সে, তারপর ভাঙা ভাঙা কেশে ফের কথা কইতে শুরু করল, আমি উৎকর্ণ হয়ে শুনে গেলাম।
তা
গােড়ায় জীবনটা আমার ছিল ঠিক আর পাঁচজনের মতােই।
জন্ম আমার ভরােনেজ গবেনিয়ায়, ১৯০০ সালে। গহযুদ্ধের সময় ছিলাম লাল ফৌজে, কিকভিজের ডিভিসনে। ২২ সালের দুর্ভিক্ষের
সময় যাই কুবানে, কুলাকের ঘরে গাধার মতাে খাটি, তাই টিকে যাই। মা বাপ আর
বােনটা ঘরেই ছিল, না খেয়ে মরে।
একলা পড়লাম। আর আত্মীয়স্বজন - একেবারে
তিনকূল শনি, কেউ কোথাও নেই। তাই বছর খানেক পরে কুবান থেকে চলে এলাম, কুড়েটা বেচে দিয়ে চলে গেলাম ভরােনেজ। প্রথমে কাজ করতাম তাের সমবায়ে, তারপর কারখানায় ঢুকি, মেকানিকের কাজ শিখি। শীগগিরই বিয়ে করলাম। বৌ অনাথালয়ের মেয়ে।
মা-বাপ নেই। তা বৌটি আমার
ভালােই জুটেছিল। ঝগড়ুটে নয়, হাসিখুশি, কাজ কর্মে ভারি মন, আর বুদ্ধি কী,
আমি তার কাছে লাগি
।
দুঃখকষ্ট যে কী জিনিস
সেটা সে ছােটো থেকেই
জানত, হয়ত সেই ছাপ পড়েছিল তার স্বভাবে। এমনি পাশ থেকে দেখলে তেমন কিছু নয়, কিন্তু আমি তাে আর পাশ থেকে
দেখতাম না, দেখতাম যে মুখােমুখি। তার
চেয়ে সুন্দরী, তার চেয়ে কাম্য ধন আমার দুনিয়ায়
আর ছিল না, হবেও না!
কাজ
থেকে ঘরে ফিরি হয়রান হয়ে, কখনাে বা আবার তিরিক্ষি
মেজাজে। কিন্তু না, কড়া কথার জবাবে একটি কড়া কথাও সে কইত না।
আদর করে, সােহাগ করে ভেবে পেত না কোথায় বসাবে,
টানাটানির সংসার থেকেই ভালােমন্দ দু'একটা রান্না
করে রাখত। মন হালকা হয়ে
আসত ওকে দেখে, খানিক বাদেই ওকে জড়িয়ে ধরে বলতাম, “মাপ কর গাে ইরিনকা,
গালমন্দ করেছি। জানিস, কাজে আজ বড়াে ঝকমারি
গেছে।” বাস, ফের ভাব হয়ে যেত আমাদের, মন ভরে যেত
শান্তিতে। জানাে তাে ভায়া, কাজের পক্ষে সেটা কত দরকার ? সকালে
ধরমরিয়ে জেগে ছুটতাম কারখানায়, যে কাজেই হাত
দিতাম। তড়বড়িয়ে কাজ চলত! বুদ্ধিমন্ত সখী-গিন্নির এই হল সুবিধে।
কখনাে
কখনাে মাইনের পর বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে
মদ খেতে হত। বাড়ি ফিরতাম এমন টলমলে পা ফেলে যে
দেখে বাইরের লােকের ভয় পেয়ে যাবার কথা। চওড়া বড়াে রাস্তা - তাতেও যেন হাঁপ ধরে, গলিঘজির কথা তাে ছেড়েই দাও। তখন ছিলাম এক মন্দ জোয়ান,
অসুরের মতাে, টানতে পারতাম খুব, তবে বরাবর নিজের পায়ে হেটেই বাড়ি ফিরেছি। মাঝে মাঝে অবিশ্যি শেষ পথটুকু এসেছি তােমার বটম গিয়ারে, মানে হামাগুড়ি দিয়ে আর কি, তবে
বাড়ি পৌছেছি। তাতেও কিন্তু বকা ঝকা, চেচামেচি গালমন্দ কিছুই না। ইরিনকা আমার কেবল হাসত একটু, তাও অবিশ্যি সাবধানে, নেশার মাথায় আবার আমার রাগ না চড়ে। পােষাক
আষাক ছাড়িয়ে আস্তে করে বলত, “দেয়ালের ধার ঘেষে শােও গাে, নইলে ঘুমের ঘোেরে খাট থেকে পড়ে যাবে।” আমি তখন একেবারে খানের বস্তার মতাে ধরাশায়ী, চোখের সামনে সবকিছু ঘুরছে। শুধু ওই ঘুমের মধ্যেই
টের পেতাম মাথায় আমার আস্তে আস্তে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে সে, আদর করে কী যেন বলছে
ফিসফিস করে – আমার জন্যে মায়া হচ্ছে আর কি ...।
সকালে
কাজে যাবার ঘণ্টা দুই আগেই সে আমায় ঠেলে
তুলত, নেশার ঘাের কাটাবার জন্যে। জানত নেশা হলে আমি কিছু খাই না, নােনা শসা টসা কিছু একটা জোগাড় করে আনত, ভােদকা ঢেলে আনত পল তােলা গেলাসটায়,
“নাও, খেয়ে খােয়ারি ভাঙো আন্দ্রিউশা। তবে এমন আর কোরাে না।
লক্ষীটি, কেমন?” এমন করে বিশ্বাস করলে সে বিশ্বাসের মান
না রেখে পারা যায়, বলাে? সেটা খেয়ে বিনা কথায় শুধু চোখের চাউনিতে ধন্যবাদ জানিয়ে চুমু খেয়ে কাজে যেতাম লক্ষী ছেলের মতাে। আর ধরাে, আমার
নেশার অবস্থায় ও যদি আমায়
বকুনি দিত, চেচামেচি গালমন্দ করত, তাহলে ভগবানের দিব্যি, পরের দিনও ঠিক মদ টেনে বাড়ি
ফিরতাম। কত সংসারে তাই
তাে হয়, বৌ যেখানে তলিয়ে
বােঝে না ; অমন আমি ঢের দেখেছি গাে, জানি।
শীগগিরই
ছেলেমেয়ে শুরু হল। প্রথমে ছেলে হল, বছর খানেক বাদে দুটি মেয়ে ... ইয়ার-বন্ধুদের সঙ্গ ছাড়ি তখন। মাইনে যা পেতাম সবটাই
ঘরে এনে দিতাম, সংসারে তখন লােক তাে কম নয়, মদ
টানার সুযোেগ কোথায়। ছুটির দিনে। এক মগ বিয়ার
খেয়েই ইতি দিতাম।
উনত্রিশ
সালে আমার ঝোঁক গেল মােটর গাড়ির দিকে। গাড়ি চালাতে শিখলাম, বসলাম লরির স্টিয়ারিং হইলে। তারপর ওইটেই চলল, কারখানায় ফেরার আর ইচ্ছে হল
না। ড্রাইভারির কাজটায় ফুর্তি লাগত বেশি। এইভাবেই দশ বছর কাটল,
কেমন করে কাটল নজরই করিনি। কেটে গেল যেন স্বপ্নের মধ্যে। তা দশ বছর
আর এমন কি। বয়স হয়েছে এমন যাকে জিজ্ঞেস করকে করাে না, কেমন করে জীবন কাটাল সেটা খেয়াল রেখেছে কে? একদম খেয়াল থাকে না! অতীত সেটা তােমার ওই আবছায়ায় ঢাকা
দরের স্তেপ ডাঙাটার মতাে। সকালে যখন পেরিয়ে আসছি তখন সবই বেশ পরিষ্কার, কিন্তু মাইল কুড়ি হেটে আসতেই সে স্তেপ ধধ,
আবছায়ায় ঢেকে বসেছে, এখান থেকে আর বােঝাই যায়
না বন নাকি ঝােপঝাড়,
হাল জমি নাকি ঘেসাে মাঠ...
এই দশ বছর আমি খেটেছি রাত দিন। রােজগার হত ভালােই, অন্য লােকের চেয়ে খারাপ থাকতাম না। ছেলেমেয়েগুলাের জন্যেও আনন্দ হত ; সব কটিই ভালাে পড়াশুনা করত আর বড়াে ছেলেটির এমন মাথা ছিল অঙ্কে যে সদরের কাগজে পর্যন্ত তার খবর বেরয়। ও বিদ্যায় ওর এমন গণ যে কোথেকে দেখা দিল ভায়া, সে আমি নিজেও ভেবে পাই না। তবে ভারি গর্ব হত তার জন্যে, ওহ, কী গর্বইহত!
দশ বছরে কিছুটা টাকা জমাই, যুদ্ধের আগে একটা বাড়ি তুলি, দুটি ঘর, একটি ভাঁড়ার, একটি বারান্দা। দুটো ছাগল কিনেছিল ইরিনা। লােকের আর কত দরকার: ছেলেমেয়েরা জাউ খায় দুধ দিয়ে, মাথার ওপর চালা আছে, জামা আছে, জুতাে আছে – সবই ঠিকঠাক। শুধ, বাড়িটা তুলেছিলাম বেয়াড়া জায়গায়। সরকার থেকে বাড়ি তােলার যে জায়গাটা পেয়েছিলাম সেটা বিমান কারখানা থেকে বেশি দুরে নয়। অন্য জায়গায় ঘর তুললে হয়ত জীবনটা আমার অন্যরকমই হত ... । তারপর তাে তােমার ওই যুদ্ধ। পরের দিনই সমর দপ্তর থেকে ডাক পড়ল, পরশুই যাত্রা করাে আর কি। বিদায় দিলে চারজনেই – ইরিনা, আনাতলি আর দুই মেয়ে নাস্তেকা আর ওলাশকা। ছেলেমেয়ে সবাই বেশ সহ্য করেই রইল। তবে মেয়েটির ওইটি বাদ গেল না, চোখ ছলছল করে উঠল। আনাতলির কাঁধদুটো শুধ, কেপে উঠল একটু যেন শীত করছে - সতের বছর চলছিল তার, আর আমার ইরিনা ... আমাদের গােটা সতের বছরের বিয়ের জীবনে অমনটি ওকে আর কখনাে দেখিনি। সারা রাত ওর চোখের জলে আমার জামার কাঁধটা বুকটা শুকতে পায়নি, সকালেই ফের সেই বত্তান্ত ... স্টেশনে এসেছিলাম, কিন্তু ওর কষ্ট দেখে ওর দিকে তাকাতে পারছিলাম না: কেদে কেদে ঠোঁট ফোলা, রুমালের বাঁধন খসে এলােমেলাে চুল বেরিয়ে পড়েছে, চোখদুটো ঘােলাঘােলা, হাবা-হাবা, মাথা-খারাপ লােকের মতাে। কম্যান্ডাররা গাড়িতে ওঠার হকুম দিতেই ও আমার বুকের ওপর আছড়ে পড়ে গলা জড়িয়ে থরথরিয়ে কাঁপতে লাগল কাটা গাছের মতাে ... ছেলেমেয়েরা বােঝায়, আমিও বােঝাই, কিন্তু বাগ আর মানে না। অন্য মেয়েরা স্বামীর সঙ্গে, ব্যাটার সঙ্গে কথা কইছে, আর আমারটি আমার সঙ্গে লেপটে রইল একেবারে যেন ডালের সঙ্গে পাতা, কেবলি কাঁপে, মুখ দিয়ে একটি কথাও বেরয় না। আমি বলি, “ইরিনকা, অবুঝ হােস না লক্ষীটি, বিদায় দিয়ে দুটো কথা অন্তত বল।” শেষ পর্যন্ত একটা করে কথা বলে আর ফোঁপায় : “আন্দ্রিউশা, আন্দ্রিউশা আমার ... এ জীবনে ... দেখা হবে না ... আর দেখা হবে না... আমাদের ...”
ওর
জন্যে কষ্টে তখন আমারই বলে বুক ফেটে যাচ্ছে, তার ওপর এই কথা। বুঝতে
তাে হয়, ছেড়ে যাওয়া আমার পক্ষেও সহজ নয়, শ্বশুর বাড়ি পিঠে খেতে তাে আর যাচ্ছি। রাগ
হয়ে গেল আমার। জোর করে হাত ছাড়িয়ে অল্প একটু ঠেলা দিলাম। ঠেলাটা আস্তেই দিয়েছিলাম কিন্তু গায়ে যে আমার বেসামাল
জোর; টলে মলে তিন পা পিছিয়ে গেল,
তারপর টুকটুক করে ফের এগিয়ে আসে আমার দিকে, দুহাত বাড়িয়ে দেয়। আমি চেচাই, “আচ্ছা ধরন বাপ, বিদায় দেবার ? জ্যান্ত থাকতেই কবর দিতে লাগলি যে?” তবে ফের বুকে জড়িয়ে ধরলাম ওকে, বুঝতে পারছিলাম স্বজ্ঞানে নেই ...'।
কথার
মাঝখানে হঠাৎ কাহিনী থেমে গেল তার, চকিত স্তব্ধতার মধ্যে কানে এল ওর গলার
মধ্যে কী একটা ঘড়ঘড়ে।
ফোঁসফোঁসে শব্দ উঠছে। আলােড়নটা আমাকেও স্পর্শ করল। আড়চোখে তাকালাম, কিন্তু তার মরার মতাে নেভা নেভা চোখে এক ফোঁটা জলও
দেখলাম না। বিষন্ন মাথাটা ঝকিয়ে বসে আছে সে, বেসামাল হয়ে নেতিয়ে পড়া বড়াে বড়াে হাত দুখানা। অল্প অল্প কাঁপছে, কাঁপছে থতনিটা, কাপছে তার কঠিন ঠোঁটদুটো ...
আস্তে
করে বললাম, “ছি অমন করে
না, ভেবাে না ওসব কথা।
কিন্তু আমার কথাটা সম্ভবত ওর কানে গেল
না, কী একটা বিপলে
ইচ্ছাশক্তিতে আবেগটা দমন করে কেমন একটা ভাঙা ভাঙা, অদ্ভুত রকমের বদলে যাওয়া গলায় বললে ; ওকে যে আমি তখন
ঠেলে দিয়েছিলাম তার জন্যে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত, মরব তব, নিজেকে ক্ষমা করতে। পারব না!
আবার
অনেকক্ষণ ধরে চুপ করে রইল সে। সিগারেট পাকাবার চেষ্টা করলে, কিন্তু খবরের কাগজটা ছিড়ে তামাকটা ছড়িয়ে পড়ল কোলের মধ্যে। শেষ পর্যন্ত কোনাে রকমে একটা বিড়ির মতাে বানিয়ে কয়েকবার সতৃষ্ণ টান দিয়ে কেশে বলে চলল : ‘ইরিনার হাত ছাড়িয়ে দুই হাতে ওর মুখটি তুলে
ধরে চুম, খেলাম, ঠোটদটি ওর একেবারে বরফের
মতাে। ছেলেমেয়েদের কাছে বিদায় নিয়ে ছুটলাম গাড়ির দিকে, গাড়ি তখন ছেড়ে দিয়েছে, লাফিয়ে উঠলাম পা-দানিতে। আস্তে
আস্তে গাড়ি চলছিল; ওদের পেরিয়ে যেতে হল। দেখলাম অনাথ ছেলেমেয়েরা আমার জোট বেধে দাঁড়িয়ে আছে, হাত নাড়াচ্ছে, হাসার চেষ্টা করছে, কিন্তু হাসি আর ফুটছে না।
বুকে হাত জোড় করে খড়ির মতাে শাদা ঠোঁট নাড়িয়ে কী যেন ফিসফিস
করছে। ইরিনা, তাকিয়ে আছে আমার দিকে, পলকটিও পড়ছে না, দেহখানা কেমন সামনের দিকে ঝোঁকা, যেন ঝড় ঠেলে এগুতে চাইছে ... মনের মধ্যে ওর এই ছবিটাই
সারা জীবন থেকে গেছে। বুকের ওপর দুই হাত জড়াে করা, শাদা শাদা ঠোট, জল ভরা দুই
চোখ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে ... স্বপ্নে ওকে প্রায়ই দেখি এই চেহারায় ... তখন
ওকে অমন ঠেলে দিয়েছিলাম কেন? মনে হলে এখনাে পর্যন্ত যেন ভোঁতা ছরিতে বুকের মধ্যে কাটতে থাকে ...
ইউক্রেইনের
বেলায়া সেকত-এর কাছে আমরা
সারি বাধলাম। আমায় দিলে “জিস-৫” গাড়ি, তাতে
করেই ফ্রন্টে যাই। তবে যুদ্ধের কথা তােমায় আর কী বলব,
নিজেই দেখেছ, জানােই তাে প্রথমটা কী দাঁড়িয়েছিল। বাড়ি
থেকে প্রায়ই চিঠি পেতাম, নিজে তেমন লিখতাম না। লিখব আর কী, সবই
বাপ, ঠিক আছে, এক আধটু লড়ছি,
এখন পেছিয়ে এলেও শীগগিরই বল জুটিয়ে জার্মানদের
দেখিয়ে দেব। তাছাড়া আর লেখবার কী
আছে? হয়রানির এক শেষ তখন,
চিঠি লেখার সময় কই। আর এও বলি,
করুণ সুরে তান ধরার ঝোঁক আমার ছিল না, সইতে পারি না ওই সব
প্যানপেনেদের, দিনের পর দিন কারণে
অকারণে নাকের জলে চোখের জলে যারা চিঠি পাঠাত : “ভারি কষ্ট, আর পারি না,
দেখ না কোন দিন
মারা পড়ি।” এমনি করেই তােমার ওই ম্যাদামারারা ঘ্যান
করে দরদ খুজছে, গলে পড়ছে আর এইটে বােঝে
না যে এই ফ্রন্টের
পেছনে বেচারি অভাগা বৌ ছেলেমেয়েদের ভাগ্যেও
তাে আর কম কষ্ট
যায়নি। গােটা রাজ্যটাই ছিল ওদের কাঁধে ভর করে। অমন
একটা ভারের তলে পিষে যে যায়নি, তাতেই
বােঝাে কী জোর আমাদের
মেয়েদের আর বালবাচ্চাদের কাঁধে
! ভেঙে তাে পড়লই না, দাঁড়িয়ে রইল। আর এই সব
প্যানপেনেগুলাে কিনা করণে করণ চিঠি পাঠিয়ে খাটিয়ে মেয়েগুলাের পেছনে ল্যাঙ মারছেন! এমন চিঠির পর মেয়েটি আর
কী করবে, হাল ছেড়ে দেবে, কাজে আর মন লাগবে
না। উহ, তুই যে মরদ, তুই
যে সৈন্য সে তাে দরকার
হলে সবকিছু সহ্য করবি, সব কিছু পেরিয়ে
যাবি বলে। আর তাের মধ্যে
যদি মেয়েলী গ্যজিলা থাকে বেশি, তাে যা বাপ, কচি
দেওয়া ঘাগরা পর গে, তাের
শুকনাে পাছাটা খানিক নধর দেখাবে, অন্তত পেছন থেকে মেয়ের মতাে লাগবে খানিকটা, গিয়ে বীট ক্ষেতের নিড়ানিতে লাগ, নয়ত গরু, দুই গে যা, অমন
লােকের ফ্রন্টে দরকার নেই, তােকে ছাড়াই এমনিতেই সেখানে পচা গন্ধ অনেক!
লড়াইয়ে
একবছরও কাটল না ... তার মধ্যেই দুবার জখম হই, তবে দুবারই অল্পের ওপর দিয়ে যায় : একবার হাতে, দ্বিতীয় বার পায়ে ; প্রথমবার এরােপ্লেন থেকে গুলি, পরের বার গােলার চাঙ। জার্মানরা আমার গাড়িটার আগা পাছা ঝাঝরা করে দেয়, তবে আমি পার পেয়ে যাই ভায়া, প্রথম দিকে ভাগ্য ভালাে ছিল। একবার পার পেয়ে গেলাম, দুবার, তারপর একেবারেই পগার পার ... বন্দী হয়ে গেলাম জোভেরি। কাছে উনিশ শ’ বেয়াল্লিশ সালের
মে মাসে; ভারি বেকায়দার ব্যাপার; জার্মানরা তখন জোর আক্রমণ চালিয়েছে, আমাদের একটা ১২২ মিলিমিটার হাউইটজার ব্যাটারির গােলা প্রায় ফুরিয়ে গিয়েছিল; আমার লরিটায় গােলা চাপানাে হল একেবারে যত
পারা যায়, মাল তােলায় আমিও খাটলাম একেবারে ঘাম ঝরিয়ে। ভয়ানক তাড়াহুড়া ছিল, কেননা লড়াইটা আমাদের কাছিয়ে আসছিল : বাঁ দিক থেকে শােনা যাচ্ছে কাদের যেন ট্যাঙ্কের ঘর্ঘর, ডান দিকে গুলি চলছে, সামনে গুলি চলছে, সঙ্গীন হয়ে উঠেছে অবস্থাটা ...
আমাদের
কমান্ডার জিজ্ঞেস করলে, “পারবি যেতে সকোলভ ?” ও আর জিজ্ঞেস
করবার কী আছে। ওখানে
হয়ত আমাদের কমরেডরা মরছে আর এখানে আমি
বসে বসে কী আঙুল চুষব?
বললাম, “বলবার কী আছে। যেতেই
হবে, বাস!” বললে, “বেশ হাঁকা! একেবারে প্রাণপণ করে !”
আমিও
হাঁকালাম। অমন ভাবে জীবনে আর কখনাে গাড়ি
চালাইনি। জানতাম, যে মাল বইছি
সেটা আল নয়, এ
মাল নিয়ে যেতে হয় খুব হশিয়ার হয়ে, কিন্তু কমরেডরা যখন খালি হাতে লড়ছে, সারা রাস্তাটা জুড়ে যখন গােলা দাগা হচ্ছে, তখন কোথায় তােমার হশিয়ারি। কিলােমিটার দুয়েক গিয়েছি, শীগগিরই কাঁচা পথে বাঁক নিয়ে ব্যাটারিটা যেখানে আছে সেই খাদটায় পৌছব, দেখি কি, মাইরি! মাইরি! – রাস্তার বাঁ দিকে ডান দিকে খােলা মাঠের মধ্যে এসে পড়েছে আমাদের পদাতিকরা, তাদের তাক করে মাইন ফাটছে। কী করি এখন?
ফিরে তাে যাওয়া যায় না? ব্যাটারিটাও মাত্র কিলােমিটার খানেক দর। মেঠো পথেই বাঁক নিলাম, তবে পৌছনাে আমার আর হল না,
ভায়া ... দুর পাল্লার কামান থেকে নিশ্চয় একটা ভারি গােলাই এসে পড়েছিল আমার গাড়ির কাছে। আওয়াজ টাওয়াজ কিছু শুনিনি, মনে হল মাথার ভেতর
কী কিছু, একটা ফেটে গেল, তাছাড়া আর কিছু মনে
নেই। কেমন করে যে বে'চে
রইলাম কে জানে, রাস্তাটা
থেকে মিটার আটেক দরে পড়েছিলাম, কতক্ষণ তাও ভেবে পাই না। জ্ঞান ফিরে এল, কিন্তু খাড়া হয়ে উঠে আর দাঁড়াতে পারি
না: মাথাটা নড়বড় করছে, কম্পজরের মতাে সারা শরীর কাঁপছে, চোখে অন্ধকার দেখছি, বাঁ কাঁধে খচমচ মড়মড় করছে কী যেন, আর
সারা গায়ে এমন ব্যথা যেন দুদিন ধরে কে আমায় যা
পেয়েছে তাই দিয়ে সমানে পিটিয়েছে। পেটে ভর দিয়ে অনেকক্ষণ
ঘষটে ঘষটে শেষ পর্যন্ত কোনাে রকমে দাঁড়ালাম। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না কোথায় আমি,
ঘটেছেই বা কী। স্মৃতি
আমার একেবারে সাফ। কিন্তু ফের শুতেও আবার ভয় হচ্ছে। ভাবছি, একবার শুয়েছি কি আর উঠতে
পারব না, মরেই থাকব। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এপাশ ওপাশ কেবলি টলতে লাগলাম ঝড়খাওয়া পপলার গাছের মতাে।
যখন
সম্বিত ফিরল, সবকথা মনে পড়ল, চারিদিকটা ভালােমতাে ঠাহর করে দেখলাম, তখন ঠিক যেন কেউ সাঁড়াশী দিয়ে চেপে ধরল আমার হৃৎপিণ্ডটা : যে গােলাগুলাে বয়ে
আনছিলাম, দেখি সেগুলাে চারিদিকে ছড়ানাে, খানিক দূরে আমার লরিটা একেবারে পিণ্ড পাকিয়ে উলটে পড়ে আছে চাকাগুলাে ওপর দিকে করে, আর লড়াইটা চলছে
আমার পেছন দিকে ... সে আবার কী?
লকোবার
কিছু নেই, ওই দেখেই আমার
পা বাপ, আপনা থেকেই দুমড়ে গেল উল্টে পড়লাম কাটা লােকের মতাে, বুঝতে যে আর বাকি
নেই ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে গেছি, ফ্যাশিস্টদের হাতে বন্দী হয়েছি বলাই ভালাে। যুদ্ধে কী না হয়
দ্যাখাে ... বন্দী হয়ে পড়েছি অথচ নিজের ইচ্ছেয় নয় - ওহ, সে যে কী
ব্যাপার ভায়া, বলা সহজ নয়! নিজের গায়ে ছ্যাকা খেয়ে যার সে জ্ঞান না
হয়েছে, তাকে সহজে বােঝানাে যাবে , ভালােমতন বােঝানাে যাবে না কী সে
ব্যাপার।
তা
শুয়ে আছি, শুনেছি ঘর্ঘর করছে ট্যাঙ্ক। চারটে মাঝারি গােছের জার্মান ট্যাঙ্ক আমার পাশ দিয়ে পুরাে দমে চলে গেল সেই দিকে যেখান থেকে আমি এসেছিলাম গােলা নিয়ে ... কী রকম লাগে
বলাে? তারপর কামান টানতে টানতে গেল কামান-টানা ট্রাক্টর, তারপর একটা ফিল্ড কিচেন, তারপর পদাতিকরা – খুব বেশি নয়, সব মিলিয়ে ঝড়তি-পড়তি এক কম্পানির মতাে।
চোখের কোণ দিয়ে একটু করে দেখি, আর ফের চোখ
বুজে মাটিতে গাল চেপে ধরি; ওদের দিকে চাইতেই গা ঘলিয়ে আসছিল
একেবারে, বমি বমি লাগছিল বুকের মধ্যে ...
ভাবলাম
সব চলে গেছে, মাথা তুলতেই দেখি ছয় জন সাবমেসিনগানার একেবারে
আমার কাছ থেকে শ'খানেক মিটার।
দরে। দেখি, রাস্তা ছেড়ে আসতে লেগেছে সােজা আমার দিকে। আসছে একেবারে চুপচাপ। ভাবলাম : মরণ তাহলে ঘনালাে।” উঠে বসলাম - শয়ে শয়ে মরতে ইচ্ছে হল না, তারপর
দাঁড়ালাম। কয়েক পা দুরে থাকতেই
ওদের একজন কাঁধ ঝাঁকিয়ে সাবমেসিনগানটা নামাল। মানুষ কেমন মজার চিজ দ্যাখাে: সে সময়টা তােমার
কোনাে আতঙ্ক, বুকের মধ্যে কোনাে কাপনি কিছুই কিন্তু বােধ হল না ভায়া,
চেয়ে চেয়ে কেবল ভাবছি কী জানাে: “এবার
আমার ওপর এক পশলা চালাবে,
কিন্তু মারবে কোথায়, মাথায় নাকি বুক বরাবর?” দ্যাখাে দিকি, দেহের কোন খানটায় বেধাবে, তাতে যেন আমার বড়াে এসে যাবে।
ছােকরা
জোয়ান, বেশ সুঠাম গড়ন, কালাে চুল, ঠোট একেবারে সততার মতাে সর, চোখ ঘোঁচ করা। ভাবলাম : “এটা মারবেই, ভেবেও দেখবে না।” বটেও তাই: সাবমেসিনগান বাগিয়ে ধরল। আমি সােজা ওর চোখে চোখেই
তাকিয়ে, চুপ করেই আছি, আর অন্য একটা,
কর্পোরাল না কী কে
জানে, বয়সে একটু বড়াে, বয়স্কই বলা যায়, কী যেন হে'কে বলে ওকে
ঠেলে সরিয়ে দিলে, আমার কাছে এসে ওদের নিজেদের ভাষায় কী সব ভ্যাড়ভ্যাড়
করলে, আমার ডান হাতটা মুড়ে দেখলে, মাসল টিপে যাচাই করলে আর কি। টিপে
টুপে দেখে বলে, “ও-ও-ও!”
রাস্তার দিকে দেখায়, সুর্যাস্তের দিকে। মানে: “যা বাপ, গাধার
খাটুনি খাট গিয়ে আমাদের রাইখের জন্যে।” মনিব হয়ে বসল শালা, কুত্তার বাচ্চা!
| কালাে-চুলােটা ওদিকে নজর দিলে আমার বুটের দিকে, বুটজোড়া দেখতে বেশ মজবুত, আঙুল দিয়ে দেখায় : “খুলে দে।” মাটিতে বসে বট খুলে দিলাম
ওকে। হাত থেকে সে বট ও
প্রায় ছিনিয়েই নিলে। পায়ের ফেট্টি খুলেও এগিয়ে দিলাম ওর দিকে, আর
ওই বসে বসেই চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগলাম। ও কিন্তু হল্লা
করে নিজেদের ভাষায় কী সব গালমন্দ
করে ফের সাবমেসিনগান টেনে নিল। বাকিরা সবাই হাসলে খ্যাকখ্যাঁক করে। এই করেই ভালােয়
ভালােয় চলে গেল। শুধ, ওই কালােচুলােটা বড়াে
রাস্তা পর্যন্ত বার তিনেক পেছন ফিরে দেখলে আমার দিকে, চোখ ঝিকঝিক করছে একেবারে জানােয়ারের মতাে, রেগে ফসছে, কিন্তু কেন দ্যাখাে দিকি ? যেন ও নয়, আমিই
ওর বুট কেড়ে নিয়েছি! এই তাে ব্যাপার
ভায়া, উপায় আর কী, পথে
এসে উঠলাম। এক চোট মুখ
খিস্তি করে পা বাড়ালাম পশ্চিমের
দিকে, চললাম বন্দী হতে ..
কিন্তু
হাঁটাটা তখন আমার ঠিক আসছিল না, ঘণ্টায় এক কিলােমিটারের বেশি
নয়। ভাবছি সামনে পা ফেলব, কিন্তু
এদিক ওদিক টলছি, রাস্তার এধার থেকে ওধারে ঝকে ঝকে পড়ছি মাতালের মতাে। খানিকটা এগােলাম, পেছন থেকে এসে আমার সঙ্গ ধরল আমাদেরই একদল বন্দী, আমি যে ডিভিসনে ছিলাম,
সেই ডিভিসন থেকেই। তাদের তাড়িয়ে নিয়ে আসছে জন দশেক জার্মান
সাবমেসিনগানার। যেটা দলের সামনে ছিল সেটা আমার কাছে এসেই কোনাে কথা না বলে তার
সাবমেসিনগানের হাতল দিয়ে অমাির মাথায় মারলে এক বাড়ি। পড়ে
গেলেই ও আমায় মাটিতে
গেথে দিয়ে যেত, কিন্তু আমাদের লােকেরা আমায় পড়ন্ত অবস্থায় ধরে ফেলে দলের ভেতর দিকে ঠেলে দিলে, আধঘণ্টা খানেক আমায় প্রায় বয়ে নিয়ে যায়। জ্ঞান ফিরতে একজন ফিসফিস করে বললে, “ভগবানের দোহাই বাপ, পড়িস না যেন। যেমন
করে পারিস টেনে চল, নইলে মারা পড়বি।” আমার তখন শক্তি আর নেই, তব,
চললাম। | সৰ্য পাটে বসতেই জার্মানরা গার্ড আরাে বাড়ালে, লরিতে করে এল আরাে গােটা
কুড়ি সাবমেসিনগানার, জোর কদমে মার্চ করালে আমাদের। আমাদের মধ্যে যারা জবর রকমের জখম, তারা বাকিদের সঙ্গে তাল রাখতে পারছিল না, স্রেফ পথের ওপরেই তাদের গুলি করে মারা হল। দুজন পালাবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ভাবেনি শালার চাঁদনি রাতে ফাঁকা মাঠে তাদের তাে বেশ ভালােই দেখা যাবে, তারাও গুলি খেয়ে মরল বৈকি। মাঝরাতে আমরা এসে পৌছলাম কোন একটা আধপােড়া গাঁয়ে। ভাঙা গম্বুজওয়ালা একটা গির্জায় আমাদের ঢােকানাে হল রাত কাটাবার
জন্যে। একেবারে পাথরের মেঝে, এক গােছ খড়ও
নেই, গায়ে আমাদের কারাে ওভারকোটও নেই, শুধুই প্যান্ট আর কোর্তা, তাই
কিছু বিছিয়ে শােবারও উপায় ছিল। কারাে কারাে আবার কোর্তাও নেই, শুধুই সতী গেঞ্জি। এদের বেশির ভাগই সব জুনিয়র কম্যান্ডার।
উদি টুদি খুলে ফেলেছে যাতে সাধারণ সৈন্য থেকে তাদের আলাদা করে চেনা যায়। গােলন্দাজ বাহিনীর লােকেদেরও কোনাে জামা ছিল ; কামানের কাছে খালি গায়ে যে ভাবে কাজ
করছিল সেই অবস্থাতেই বন্দী হয়ে যায়।
রাত্রে
এমন ঝমঝমে বৃষ্টি নামল যে সবাই একেবারে
ভিজে জবজবে হয়ে গেলাম। ভারি গােলা কিম্বা এরােপ্লেন থেকে বােমা পড়ে গজটা একেবারে ভাঙা, বাকি ছাতটাও গােলার টুকরােয় ঝাঁঝরা, তাই গির্জার বেদীতে পর্যন্ত শুকনাে জায়গা একটুও রইল না। এই ভাবেই সারা
রাত আমরা গির্জায় কাটালাম অন্ধকার খোঁয়াড়ে ভ্যাড়ার গাদার মতাে। রাত্রে এক সময় শুনি,
আমায় ঠেলা দিয়ে কে যেন বলছে,
“জখম আছে নাকি কমরেড ?” বললাম, “তাের তাতে কী ভায়া ?” বলে,
“আমি ডাক্তার, কিছু, কাজে লাগতে পারি।” বললাম আমার বাঁ কাঁধটা খচখচ মড়মড় করছে, ফুলে উঠছে, যন্ত্রণা হচ্ছে সাংঘাতিক। ও কড়া গলায়
বললে, “কোর্তা আর তলের শার্টটা
খুলে ফ্যালাে।” জামা খুলে ফেললাম। ও আমার কাঁধে
হাত দিয়ে সর, সর, আঙুল দিয়ে এমন টিপতে লাগল যে চোখে অন্ধকার
দেখতে লাগলাম। দাঁতে দাঁত চেপে বললাম, “তুই দেখছি মানুষের ডাক্তার নস, ঘােড়ার বদ্যি। ব্যথার জায়গাটায় অমন করে টিপছিস কেন বল তাে, দয়ামায়া
নেই ?” ও কেবল টিপেই
চলে, মেজাজ দেখিয়ে বলে, “চুপ করে থাকো। কথা বলার ঢঙ দেখাে। সামলে,
আরাে লাগবে কিন্তু।” এই বলে এমন
এক ঝটকা দিলে যে কী বলব
চোখে তারা দেখতে লাগলাম।
জ্ঞান
ফিরতে জিজ্ঞেস করলাম, “হতভাগা ফ্যাশিস্ট কোথাকার, কী শুরু করেছিস
তুই ? হাত আমার ভেঙে টুকরাে হয়ে আছে আর তুই অমন
হ্যাঁচকা মারছিস?” শুনি কি, লােকটা হাসছে, বললে, “ভেবেছিলাম তুই ডান হাতটা দিয়ে আমায় মেরেই বসবি। কিন্তু দেখলাম, লােকটা তুই শান্তশিষ্ট। তবে হাড় তাের ভাঙেনি, মচকে গিয়েছিল, ঠিক জায়গায় বসিয়ে দিলাম। তা এখন কেমন?
আরাম লাগছে খানিক ?” সত্যিই নিজেই টের পাচ্ছিলাম ব্যথাটা যেন চলে যাচ্ছে। মন থেকে ধন্যবাদ
দিলাম, লােকটা কিন্তু ততক্ষণে অন্ধকারে এগিয়ে গেছে, জিজ্ঞেস করেই চলেছে, “জখম আছে কেউ ?” একেই বলে সত্যিকারের ডাক্তার। বন্দী হয়েছে বটে, তব, ওই অাঁধারের মধ্যেই
সে তার মহাকর্তব্য করে চলেছে।
ভারি
অস্থির রাত ছিল সেটা। বাহ্যি পেচ্ছাবের জন্যেও বাইরে যাওয়া বন্ধ – জোড়ায় জোড়ায় গির্জায় আমাদের ঢােকাবার সময়েই সিনিয়র গার্ড আমাদের হকুমটা জানিয়ে দিয়েছিল। আর পােড়া কপাল
দ্যাখাে, আমাদের মধ্যে ধর্মভীর, একজনার খেয়াল চাপল বাইরে যাবে। অনেকক্ষণ চেপে চেপে ছিল, তারপর কেদে ফেললে। বলে, “গির্জা ধর্মস্থান, এ যে অশুদ্ধ
করা চলে না। আমি যে ধর্ম মানি
গাে, খৃষ্টান। কী করি বলাে
ভাই সব !” আর জানােই তাে
আমরা সব লােক কেমন
? কেউ হাসে, কেউ গাল পাড়ে, কেউ আবার মস্করা করে যত রকম সলাপরামর্শ
দেয়। আমাদের সবাই এক চোট ফুতি
পেলাম বটে, তবে ব্যাপারটার শেষ হল ভারি খারাপ।
দমাদম দরজায় বাড়ি মারতে লাগল সে, বলে বাইরে যাবে। জবাবও পেয়ে গেল; ওপাশ থেকেই দরজার এদিক থেকে ওদিক পর্যন্ত বেশ এক পশলা চালিয়ে
দিলে এক ফ্যাশিস্ট, ধর্মভীরু,
লােকটা তাে মরলই, সেই সঙ্গে আরাে তিন জন, একজন জখম হল ভয়ানক, সকালের
দিকে সেও টেসে গেল।
মরাদের
আমরা এক জায়গায় জড়াে
করে সবাই বসলাম, চুপ করে ভাবলাম খানিক: শুরুটা বিশেষ ভালাে তাে নয় ... খানিক পরে ফিসফিস কথা শুরু হল। কে কোথাকার লােক,
কোন জেলায় বাড়ি, বন্দী হল কেমন করে।
যারা একই পল্টন বা একই কম্পানির
লােক, তারা অন্ধকারে আস্তে আস্তে নিজেদের ডাকাডাকি করতে লাগল। পাশেই একটা আলাপ কানে এল। একজন বলছে, “কাল সকালে আমাদের যাত্রা করাবার আগে সারবন্দী করে কমিসার, কমিউনিস্ট আর ইহুদীদের এগিয়ে
আসতে বলবে, তখন কিন্তু তুমি লুকিয়ে থাকতে যেয়াে না বাপ, কম্যান্ডার।
তাতে কিছু ফল হবে না।
ভেবেছ, উর্দি খুলে ফেললেই তােমায় সাধারণ সৈন্য বলে ভাববে। তাতে কোনাে ফল হবে না!
তােমার জন্যে আমায়। ভুগতে হবে সেটি হচ্ছে না। আমি প্রথমেই তােমায় ধরিয়ে দেব। আমি তাে জানিই, তুমি কমিউনিস্ট পার্টিতে ঢােকার জন্যে আমাকেই কত বুঝিয়েছ, এবার
নিজের ফল ভােগ করাে।”
কথাটা যে বলছিল সে
আমার পাশেই বসে আছে, বা দিকে, আর
তার ওপাশ থেকে ছােকরাপানা গলায় কে যেন জবাব
দিল, “বরাবরই আমার সন্দেহ ছিল, তুই ক্রিজনেভ লােক ভালাে নস। বিশেষ করে যখন তুই অজুহাত দিলি, লেখাপড়া জানিস না বলে পার্টিতে
ঢুকতে চাস না। কিন্তু ভাবতে পারিনি তুই বেইমানি করবি। সাত বছরের ইশকুল তাে তুই শেষ করেছিস?” ও লােকটা বললে,
“হ্যাঁ, করেছি তাে কী হল ?” অনেকক্ষণ
ওরা চুপ করে রইল, পরে গলার স্বরে বুঝলাম কম্যান্ডার বলছে, “আমায় ধরিয়ে দিস না, কমরেড ক্রিজনেভ।” ও লােকটা আস্তে
করে হাসল। বলে, “কমরেড টমরেড সব তােমার রয়ে
গেছে ফ্রন্টের ওপাশে। আমি তোমার কমরেড নই বাপ, যতই
বলাে দেখিয়েই দেব। আপনি বাঁচলে বাপের নাম।”
চুপ
করে গেল ওরা, এমন শয়তানির কথা শুনে গা কাঁপতে লাগল।
ভাবলাম : “উহ, কুত্তার বাচ্চাটা যে নিজের কম্যান্ডারকে
ধরিয়ে দেবে, সেটি হতে দেব না ! আমার হাত ছাড়িয়ে তােকে এ গির্জা থেকে
হেটে বেরতে হবে না, ঠ্যাং ধরে কুকুরটানা করে। তােকে টেনে নিয়ে যাবে!” একটু একটু ফরসা হয়ে এল। দেখি; আমার পাশে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে একটা ভোদাখাে লােক, মাথার তলে হাত দিয়ে, আর তার কাছেই
মাত্র একটা গেঞ্জি গায়ে একটা ভারি রােগা, বোঁচা নাক ছােকরা, দুই হাতে হাঁটুদটো জড়িয়ে আছে, মুখের রং ভারি ফ্যাকাশে।
ভাবলাম : “এহ – অমন মটকোটার সঙ্গে এ ছছাকরা পেরে
উঠবে না। আমাকেই শেষ করতে হবে দেখছি।”
গায়ে
তার ঠেলা দিয়ে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “তুই। কম্যাডার ?" কোনাে কথা বললে না ও, শুধু
মাথা নাড়ল। “এ লােকটা তােকে
ধরিয়ে দেবে ?” শােয়া লােকটাকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। ফের মাথা নাড়লে সে। বললাম, “নে, পা চেপে ধর
ওর, যাতে লাথি না মারতে পারে।
চটপট !” আর আমি নিজে
ঝাঁপিয়ে পড়ে লােকটার টুটি চেপে ধরলাম। টু শব্দটিও করতে
পারল না। কয়েক মিনিট ওই ভাবে চেপে
ধরে রেখে তারপর একটু ঢিল দিলাম। বেইমানের হয়ে গেছে, জিভ বেরিয়ে পড়েছে। | এর পর এমন
বিচ্ছিরি লাগতে লাগল আমার, ভয়ানক ইচ্ছে হচ্ছিল হাত ধুয়ে ফেলি, যেন মানুষ নয়, কোনাে একটা কিলবিলে দুচো টিপে মেরেছি ... জীবনে এই প্রথম মানুষ
মারলাম তাও নিজেদের লােককেই ... ধর, নিজেদের লােক। আবার কোথায়? ও যে শত্রুর
চেয়েও খারাপ, বেইমান। উঠে কম্যান্ডারকে বললাম, “চল, এখান থেকে সরে যাই, অনেক জায়গা আছে গির্জায়।”
ক্রিজনেভ
যা বলেছিল ঠিক তাই হল, সকালে আমাদের সবাইকে সারি বন্দী করা হল গির্জার কাছে,
সাবমেসিনগান সব তাক করা
হল আর তিন জন
এস-এস অফিসার সব
অনিষ্টকর লােক বাছতে শুরু করল, মানে তাদের কাছে যারা অনিষ্টকর। জিজ্ঞেস করলে কে কে কম্যান্ডার,
কে কমিউনিস্ট, কে কমিসার, কিন্তু
তেমন কাউকে পেলে না; ধরিয়ে দেবে এমন ছুচোও কেউ এগিয়ে এল না, কেননা
কমিউনিস্ট আমাদের মধ্যে ছিল প্রায় অর্ধেকই, কম্যান্ডারও ছিল, কমিসারও ছিল সে তাে না
বললেও চলে। দু’শাের কিছু
বেশি লােক, তার মধ্যে থেকে বাছলে মাত্র চারটে। একজন ইহুদী আর তিন জন
সাধারণ রশী সৈনিক। রশী ক’টার কপাল
পড়েছিল, কেননা তিন জনেরই গায়ের রঙ ময়লাটে, চুল
কোঁকড়া। ওই রকম চেহারা
দেখলেই এসে জিজ্ঞেস করে, “ইহুদী?” বলে রশী, কিন্তু সে কথা কানেই
শুনতে চায় না, বলে, “বেরিয়ে এসাে!” – বাস! | বেচারীদের গুলি করে মারলে আর তাড়িয়ে নিয়ে
চলল আমাদের। যে কম্যান্ডারটির সঙ্গে
বেইমানটাকে খতম করেছিলাম, সে আমার সঙ্গে
ছিল পােজনান পর্যন্ত, মার্চের প্রথম দিনেই কথা নেই বার্তা নেই, থেকে থেকে রােগা রােগা হাতে আমার হাতে চাপ দিয়ে যায়। পােজনানে আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়। ব্যাপারটা হল এই।
কী
জানাে ভায়া, প্রথম দিন থেকেই আমাদের নিজেদের লােকেদের কাছে পালাবার কথা ভাবছিলাম। তবে চাইছিলাম যেন পালানােটা পাকাপাকি হয়। পােজনানে আমাদের রাখা হয় সত্যিকারের একটা বন্দী ছাউনিতে তার আগে পর্যন্ত যুতসই কোনাে সুযােগ মেলেনি। কিন্তু ওই রকম একটা
সুযোেগ মিলে গেল পােজনানে: মে মাসের শেষ
দিকে আমাদের বনে পাঠায় মরা যুদ্ধবন্দীদের জন্যে কবর খুড়তে, আমাদের অনেকেই তখন আমাশা রােগে মারা যাচ্ছিল। মাটি খড়ছি আর চারিদিকে চেয়ে
চেয়ে দেখছি। চোখে পড়ল আমাদের দুজন সেন্ট্রি জলখাবার খেতে বসেছে আর তৃতীয় জন
রােদে বসে ঝিমুচ্ছে। আমি কোঁদাল ফেলে রেখে আস্তে আস্তে গিয়ে লকোলাম ঝােপের পেছনে ... তারপর ছুট লাগালাম সােজা পবদিক ধরে ...
বােঝা
যায় চট করে খেয়াল
করতে পারেনি আমাকে। আর আমিও যে
অমন কাহিল লােক, সেও একদিনের মধ্যে চল্লিশ কিলােমিটার পাড়ি দেবার মতাে তাগদ যে কোথেকে পেয়েছিলাম
তা নিজেও ভেবে পাই না। তবে আমার ফন্দিটা কিছুই খাটল
: হতভাগা
ছাউনিটা থেকে অনেক দূরেই চলে গিয়েছিলাম, কিন্তু চারদিনের দিন আমায় ধরলে। পেছনে আমার কুকুর ছেড়ে দেয়, না-কাটা এক
ওট ক্ষেতের মধ্যে আমায় পাকড়াও করে। | ভাের হয়ে গিয়েছিল, বনটা তখনাে তিন কিলােমিটার দরে, খােলা মাঠের মধ্যে দিয়ে পেরিয়ে যেতে ভয় হল, ওট ক্ষেতের মধ্যেই
সেদিনের মতাে শুয়ে রইলাম। কিছু দানা হাতের তালুতে পিষে চিবুতে লাগলাম, পকেটেও মজুত রাখলাম কিছু। হঠাৎ শুনি কুকুরের ডাক, মােটর সাইকেলের আওয়াজ ... বুক আমার হিম হয়ে এল, কেবলি কাছিয়ে আসছিল কুকুরের ডাকটা। দু হাতে মুখ
ঢেকে উপুড় হয়ে পড়ে রইলাম, অন্তত মুখটায় যেন কামড় না দেয়। কিন্তু
ছটে এসে মিনিটের মধ্যেই আমার জামাকাপড় সব একেবারে ছিড়ে
শেষ করে দিলে। মায়ের পেট থেকে যেমন ন্যাংটা হয়ে জন্মেছিলাম একেবারে তেমনি ন্যাংটা। ওট ক্ষেতের মধ্যে
ওরা আমায় যেমন খুশি টানা হ্যাঁচড়া করলে, তারপর শেষ পর্যন্ত একটা ঢাউস কুকুর আমার বুকের ওপর থাবা গেড়ে আমার টুটির দিকে তাক করে রইল, তবে তখনাে কামড়ায়নি। | দুটো মােটরসাইকেলে চেপে এল জার্মানগুলাে। প্রথমে
নিজেরা পিটলে একেবারে সাধ মিটিয়ে, তারপর কুকুর লেলিয়ে দিলে, থাবা থাবা চামড়া আর মাংস ছিড়তে
লাগল আমার গা থেকে, ছাউনিতে
আমায় ফিরিয়ে আনলে একেবারে ন্যাংটা, সারা গায়ে রক্ত মাখা। পালাবার অপরাধে এক মাস আটক
রাখলে একলা, তাহলেও প্রাণটা গেল না ... বেঁচেই রইলাম। ওহ, ভায়া, বন্দী জীবনে কী যে সইতে
হয়েছে সে কথা ভাবতেও
কষ্ট, বলতে তাে আরাে। ওখানে ওই জার্মানিতে যে
সব অমানুষিক যন্ত্রণা সইতে হয়েছে, তােমার ওই ছাউনিতে যে
সব বন্ধ, কমরেড কষ্ট পেয়ে পেয়ে মারা পড়েছে, তাদের কথা যখন মনে হয়, তখন হৃৎপিণ্ডটা যেন একেবারে কণ্ঠায় এসে ঢিপঢিপ করে, নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। বন্দী থাকার এই দু বছরে
আমায় কোথায় না ঠেলেছে! অর্ধেকটা
জার্মানিই প্রায় ঘুরতে হয়েছে: স্যাকসনিতে ছিলাম, সিলিকেট কারখানায় খাটতাম, রর এলাকাতেও ছিলাম,
কয়লা খনিতে ডিম্বা ঠেলেছি, ব্যাভেরিয়াতেও মাটি খোঁড়ার কাজে পিঠ বেকিয়েছি, তুরিঙ্গেনেও গেছি, শয়তানই জানে শালার জার্মানির কোথায় যাইনি। নানান জায়গার আবহাওয়া, ভায়া, নানান রকমের, তবে আমাদের পিটিয়েছে আর গুলি করেছে
সবখানেই একই রকম। আর হারামজাদা দুচো
পরগাছাগলাে যেরকম পিটুনি দিত ভায়া, আমাদের এখানে জানােয়ারকেও কেউ সেরকম পিটোয় না। ঘুষি মারত, লাথি চালাত, রবের বেত হাকাত, হাতের কাছে লােহার যা কিছু পেত
তাই দিয়েই লাগাত, বন্দুকের কু'দো আর
লাঠি ডাণ্ডা তাে ছেড়েই দিলাম।
মারত
স্রেফ এইজন্যে যে তুই লােকটা
রশী, এখনাে তুই বেটা বেচে আছিস, ওই কুত্তাগুলাের জন্যে
এই যে তুই কাজ
করছিস, সেইজন্যেও পিটুনি। তাকানিটা তেমন করে হয়নি, পা ফেলাটা তেমনটা
হল না, মােড় নেওয়াটা নাকি তেমনটি নয় - এইজন্যেই পিটুনি ... মারত স্রেফ এমনি এমনি, নেহাৎ একদিন মারতে মারতে মেরে ফেলবে বলে, দেহের শেষ রক্তের দলাটা যাতে গলায় ঠেকে টে’সে যায়।
আমাদের সবাইকে পুড়িয়ে মারার মতাে গ্যাসচুল্লি সম্ভবত তত ছিল না
...
আর
খাওয়াটাও ছিল সব জায়গাতেই একই:
দেড়শ গ্রাম এরজাৎস-রটি, তার অর্ধেকটাই কাঠগুড়াে, আর এক চিলতে
গােখাদ্য বিট। খাবার জন্যে গরম জল কোথাও বা
দিত, কোথাও দিত না। বলব আর কী, নিজেই
বুঝে দ্যাখাে : লড়াইয়ের আগে ওজন ছিল ৮৬ কিলােগ্রাম, আর
হেমন্ত নাগাদ টেনে বনে বড়াে জোর পঞ্চাশ কিলাে, শুধ, হাড় আর চামড়া, নিজের
হাড় কখানাও টানতে পারতাম না। অথচ কাজটি করে যেতে হবে ঠিক, টু শব্দও করা
চলবে না, আর সে কী
কাজ, একেবারে ঘােড়ার খাটুনিরও অধম।
সেপ্টেম্বরের
গােড়ায় কুনি শহরের কাছের ছাউনিটা থেকে আমাদের ১৪২ জন সােভিয়েত যুদ্ধবন্দীকে
পাঠানাে হল বি ১৪
নং ছাউনিতে, ড্রেসডেন থেকে জায়গাটা বেশি দুরে নয়। সে সময় এখানে
আমাদের ছিল প্রায় হাজার দুই লােক। সবাই কাজ করতাম পাথর খনিতে, জার্মান পাথর ভাঙতাম, খােয়া বানাতাম বিনা যন্ত্রে। লােক পিছ দিনে চার কিউবিক মিটার - অরি সে লােকের তোমার
ধড়ে প্রাণ ঝুলে আছে কেবল একটি সততার ওপর। এইখানেই শুরু হয় : ৭ মাসের মধ্যেই
আমাদের ১৪২ জনের মধ্যে টিকে রইল কেবল সাতান্ন জন। বােঝাে ভায়া! হালটা বােঝাে! আর নিজেদের লােকেদের
কবর দিয়ে পেরে উঠছি না, ওদিকে গুজব রটল জার্মানরা নাকি স্তালিনগ্রাদ দখল করেছে, গতত মারছে সাইবেরিয়ার দিকে। গেরাের ওপর এই তােমার আর
এক গেরাে, আর এমন করে
আমাদের তাড়া দিত যে মাটি থেকে
চোখ আর তুলতে ইচ্ছে
হত , যেন ওই পরের দেশে
জার্মান মাটিতেই কবর নিতে পারলে বাঁচি। ছাউনির সেন্টিরা ওদিকে হর রােজ মদ
খাচ্ছে, গান। গাইছে, আমােদ করছে, আহাদ করছে।
একদিন
তাে সন্ধ্যেয় আমরা ব্যারাকে ফিরেছি কাজ থেকে। সারা দিন বৃষ্টি পড়েছে, ন্যাতাকানি সব ভিজে জবজবে;
কনকনে বাতাসে সবাই আমরা কুকুরের মতাে কাঁপছি, দাঁত ঠকঠক করছে। জামাকাপড় শুকিয়ে নেবার উপায় নেই, গা গরম করে
নেব, তারও জো নেই, তার
ওপর খিদেয় মরছি শুধু নয়, মরারও বাড়া। অথচ সন্ধ্যায় আমাদের খাওয়া মিলত না।
আমার
ভেজা ন্যাতাটা খুলে বাকে ছুড়ে ফেলে বললাম, “দিনে চাই চার কিউবিক মিটার কাজ, আর এদিকে হাল
যা হয়েছে তাতে এক কিউবিক জায়গাতেই
আমাদের এক এক জনের
কবর হয়ে যাবে।” শুধু এই মুখের কথাটুকু,
কিন্তু আমাদের মধ্যেই ছিল কেউ হারামজাদা, আমার ওই জলনির কথাগুলাে
নিয়ে লাগালে ছাউনির কম্যান্ডান্টের কাছে।
ছাউনির
কম্যান্ডান্ট, ওরা বলে ছাউনির ফ্যুহরার — লােকটা জার্মান, নাম মুলার, বিশেষ লম্বা নয়, গাঁট্টা গােট্টা, শণের মতাে চুল - সবই তার কেমন শাদাটে, মাথার চুল, ভুর, চোখের পাতা, এমন কি ড্যাবডেবে চোখদুটো
পর্যন্ত শাদাটেকটা। রুশ ভাষায় কথা বলে ঠিক তােমার আমার মতাে, “ও” ঘরটায় টান
ছিল, যেন একেবারে খাস ভল্গা পারেই জন্ম। আর মুখখিস্তিতে ছিল
একেবারে সাংঘাতিক ওস্তাদ। শালার হারামজাদাটা এসব কোথা থেকে যে শিখলে!
আমাদের
সারবন্দী করা হত ব্লকের সামনে
- ব্যারাকটাকে ওরা বলত ব্লক – ও আসত তার
এস-এস সাঙ্গোপাঙ্গো নিয়ে,
ডান হাতটা বাগিয়ে, সে হাতে চামড়ার
দস্তানা আর দস্তানার তলে
সীসের পাণ্ড, আঙুলগুলােয় ব্যথা লাগত না। সামনে দিয়ে হেটে যেত আর এক একজনকে
ছেড়ে প্রতিটি পরের। জনকে ঘুষি লাগাত নাকে, রক্ত বার করে ছাড়ত। এটাকে ও বলত “ইনফ্লুয়েঞ্জার
টিকা”। এই চলত
প্রত্যেকটা দিন। ছাউনিটায় ছিল মাত্র চারটে ব্লক, আর এই টিকা
দেওয়া ও চালাত আজ
এ কে, কাল পরের ব্লকে, এমনি পালা করে। খুব। গােছগাছ ছিল শালার ব্যাটা, সমানে কাজ করত, রবিবারেও ছুটি নিত না। | আমি ওই যেদিন কিউবিক
মিটার নিয়ে টিপনি কেটেছিলাম, তার পরের দিন তাে এই কম্যান্ডান্ট আমায়
ডেকে পাঠালে। সন্ধ্যায় দুই সেপাইয়ের সঙ্গে দোভাষী এসে হাজির। “আন্দ্রেই সকোলভ কে ?” বললাম, “আমি।” “চলে এসাে পেছন পেছন। ছাউনির ফুহরার খােদ ডাক পাঠিয়েছেন।” বােঝাই যায় ডাকটা কেন। ছাতু করবে আর কি।
কমরেডদের
কাছ থেকে বিদায় নিলাম – সবাই জানত মরতে চলেছি – দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে চললাম। ছাউনির সামনে দিয়ে যাচ্ছি, তারাগুলাের দিকে তাকাচ্ছি, তাদের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি, ভাবছি: “এবার তাের যন্ত্রণার শেষ হবে আন্দ্রেই সকোলভ, ছাউনির তিনশ একত্রিশ নম্বর।” ইরিনা আর ছেলেমেয়েগুলাের জন্যে কেমন
কষ্ট হল, তবে কষ্টটা পরে থেমে গেল, সাহসে বুক বাঁধতে লাগলাম, যাতে পিস্তলের ফুটোটার দিকে না কেঁপে তাকাতে
পারি, প্রাণ হারাতে যতই হােক কষ্ট হচ্ছে সেটা শত্রুরা আমার জীবনের শেষ মুহতেও যেন না দেখতে পায়
... | কম্যান্ডান্টের
আপিসখানা ফিটফাট, জানলায় ফুল, আমাদের দেশের ভালাে একটা ক্লাবের মতাে। টেবল ঘিরে বসে আছে ছাউনির সব কর্তারা। বসেছে
পাঁচটিতে, শন্যাপস গিলছে, সেই সঙ্গে চর্বির চাট। টেবলের ওপর শন্যাপসের একটা ঢাউস বােতল খােলা, রুটি, চর্বি, সিজনাে আপেল, নানা রকম টিনের খাবার। এক পলকে এই
সব একবার চোখে পড়তেই এমন ঘুলিয়ে উঠল - বিশ্বাস করবে না – আর একটু হলেই
বমি হয়ে যেত। পেটে আমার নেকড়ের মতাে ক্ষিদে - মানুষের মতাে খাওয়ার অভ্যাস তাে অনেক দিনই ঘুচেছে - আর হঠাৎ কিনা
সামনে আমার এই সব ভূরিভােজ
....
কোনাে
রকমে গা ঘােলানিটা চেপে
রাখলাম, তবে টেবল থেকে চোখ সরিয়ে নিতে বেগ পেতে হয়েছিল খুবই। | আমার ঠিক সামনেই বসেছিল আধ-মাতাল মাের,
পিস্তলটা নিয়ে খেলা করছে, এ হাত ও
হাত করছে, আমার দিকে তাকিয়ে আছে সাপের মতাে, চোখের পলকও পড়ে না। আমি তাে হাত টান করে ছেড়া হিলের জুতাে ঠুকে এটেনশন হয়ে রিপাের্ট করলাম, “হের কম্যাণ্ড্যান্ট, যুদ্ধবন্দী আন্দ্রেই সকোলভ আপনার হুকুম মতাে হাজির।” ও বলে, “কী
রে রুশ ইভান, চার কিউবিক মিটার কাজটা তাহলে বেশিই ?” বললাম, “আজ্ঞে হ্যাঁ, হের কম্যান্ডান্ট, বেশিই।” “আর এক কিউবিক
মিটারে তাের কবর কুলিয়ে যাবে?” “হ্যাঁ, হের কম্যান্ডান্ট, কুলিয়ে তাে যাবেই, কিছু, বাকিও থাকবে।” | ও উঠে দাঁড়িয়ে
বললে, “খুব একটা সম্মানের ব্যাপারই দাঁড়াচ্ছে তাের পক্ষে কেননা – এই কথার জন্যে
তােকে আমি নিজের হাতেই মারব। এখানে অসুবিধা হবে, চল বাইরে যাই,
সেখানেই পটল তুলিস।” বললাম, “সে আপনার ইচ্ছে।”
ও একটু দাড়িয়ে থেকে কী ভেবে পিস্তলটা
টেবলে রেখে এক গেলাস শন্যাপস
ঢালল, এক টুকরাে রুটি
নিয়ে তার ওপর এক চিলতে চর্বি
রেখে আমার দিকে এগিয়ে দিল। বলে, ‘মরবার আগে জার্মান সৈন্যের জয়ের জন্যে একবার পান করে নে রে বুশ
ইভান।”
আমি
ওর হাত থেকে মদের গেলাস আর চটিটা নিতে
যাচ্ছিলাম, কিন্তু কথাটা শুনে একেবারে যেন আগুনের ছ্যাঁকা লাগল। ভাবলাম: “আমি রুশ সৈন্য, পান করব কিনা জার্মান সৈন্যের জয়ের জন্যে ?! শখ কত তাের
হের কম্যান্ডান্ট! আমি শালা তাে মরবই, চুলােয় যা তুই তাের
মদ নিয়ে!”
গেলাসটা
নামিয়ে রাখলাম, রুটির টুকরােটাও রাখলাম, বললাম, “আপ্যায়নের জন্যে ধন্যবাদ, তবে মদ আমি খাই
না।” কম্যান্ডান্ট হাসল, “আমাদের জয়ের জন্যে খেতে চাস না, বেশ তাহলে নিজের মরণের জন্যে খা।” আমার আর তাতে লােকসান
কী? “নিজের মরণ আর যন্ত্রণা থেকে
রেহাই পাওয়ার জন্যে খাচ্ছি,” বলে দুই ঢােকে শেষ করে দিলাম গেলাসটা, রুটিটা কিন্তু ছুলাম না, হাতের চেটো দিয়ে দিব্যি ভদ্রলােকের মতাে মুখ মুছে বললাম, “মদের জন্যে ধন্যবাদ। আমি তৈরি হের কম্যান্ডান্ট, চলন, আমার পটল তুলবেন।”
ও
কিন্তু মন দিয়ে আমায়
দেখে বলে, “মরবার আগে অন্তত রুটি খা একটুকরাে।” আমি
বললাম, “এক গেলাসের পর
আমি খাবার মুখে তুলি না।” দ্বিতীয় গেলাস ঢেলে আমায় দিলে। সে গেলাসটাও খেলাম,
কিন্তু রুটি ছলাম না। ভাবলাম : “বাইরে যাবার আগে, জীবনের কাছ থেকে বিদায় নেবার আগে অন্তত একবার টেনে যাই।” কম্যান্ডান্ট তার ফ্যাকাশে ভুরু, কপালে তুলে বলে, “খাচ্ছিস না যে রুশ
ইভান ? লজ্জা কী।” আমি বলি, “মাপ করবেন হের কম্যান্ডান্ট, দুই গেলাসের পরও খাবার খাওয়া অভ্যেস নেই।” গাল ফুলিয়ে ঘোঘোৎ করে একেবারে হােহাে করে হেসে উঠল কম্যান্ডান্ট, হাসতে হাসতে হড়বড় করে জার্মান ভাষায় কী যেন বললে
- বােঝাই যায়। আমার কথাগুলাে সঙ্গীদের তর্জমা করে বলছিল আর কি। ওরাও
হেসে, চেয়ার ঠেলাঠেলি করে মুখে ফেরালে আমার দিকে, নজর করলাম আমার দিকে এবার চাইছে যেন একটু অন্যরকম চোখে - একটু যেন নরম চাউনি।
তৃতীয়
গেলাস ঢাললে কম্যান্ডান্ট, হাসির চোটে হাত তার কাঁপছে। এ গেলাসটি আমি
বেশ ধীরেসুস্থে খেয়ে রুটির একটু কোণায় কামড় দিয়ে টেবলে রেখে দিলাম। ইচ্ছে হল হারামজাদাগুলােকে দেখিয়ে দিই,
খিদেয় যতই মরি ওদের ছুড়ে দেওয়া টুকরােটা নিয়ে হ্যাংলামি করতে যাব না, আমার নিজের একটা রুশী মানমর্যাদা আছে, যতই চেষ্টা করুক আমায় এখনাে একেবারে জানােয়ার করে তুলতে পারেনি।
এরপর
কম্যান্ডারের মুখের ভাব গম্ভীর হয়ে উঠল, বুকের ওপর লােহার ক্রশ দুটো ঠিক করে নিলে, পিস্তলটা না নিয়েই টেবল
থেকে উঠে এসে বললে, “শােন সকোলভ, তুই হলি আসল রশ সৈন্য, সাহসী
সৈন্য। আমিও সৈন্য – ইমানদার শতকে আমি সম্মান করি। তােকে মারব না। তার ওপর আমাদের বাহাদুর সৈন্যরা আজ ভগা নদী
পর্যন্ত পৌছিয়েছে, স্তালিনগ্রাদ (বর্তমানে
ভল্গগ্রাদ
নগর) পুরােপুরি দখলে নিয়েছে। আমাদের পক্ষে এটা খুবই আনন্দের খবর। সেইজন্যে উদারতা দেখিয়ে তাের জান মাপ করে দিলাম। যা নিজের ব্লকে
ফিরে যা, আর এটা তােকে
দিলাম তাের সাহসের জন্যে।” এই বলে টেবল
থেকে একটা মাঝারি আকারের পাঁউরুটি আর এক খণ্ড
চবি দিলে আমায়।
রুটিটা
একেবারে বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরলাম, বাঁ হাতে চবির খণ্ড, এমন আচমকা ঘটনায় এমন হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম যে ধন্যবাদও জানালাম
না। বাঁয়ে ঘুরে দরজার দিকে চলেছি আর মনে মনে
ভাবছি: “এইবার আমার পিঠের মধ্যে দিয়ে সােজা চালিয়ে দেবে, খাবারটুকু নিয়ে আর সঙ্গীদের কাছে
পৌছতে হবে না।” কিন্তু কিছু হল না। এবারেও
মরণ আমার গা ঘেষে চলে
গেল, তার হিম আমেজটাই কেবল টের পেলাম ...
কম্যান্ডান্টদের
ঘর থেকে অটল পায়েই বেরিয়েছিলাম, কিন্তু বাইরে এসে একেবারে বেসামাল হয়ে টলতে লাগলাম। টলতে টলতে ব্যারাকে ঢুকে হুড়মুড় করে সিমেন্টের মেঝেয় বেঘােরে লুটিয়ে পড়লাম। আমাদের লােকেরা আমায় অন্ধকারের মধ্যেই জাগিয়ে তুললে, “কী হল বল।”
কম্যান্ডান্ট আপিসে কী হয়েছিল মনে
করে করে বললাম সব। “খাবারটা ভাগ করব কী ভাবে ?” জিজ্ঞেস
করল আমার পাশের বাকের লােকটা, গলাটা তার কিন্তু কাঁপছে। বললাম, “সবাইকে সমান করে।” ভাের হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা হল। মােটা সুতাে দিয়ে কেটে রটি আর চবি একেবারে
কাঁটায় কাঁটায় ভাগ করা হল। প্রত্যেকে পেলে দেশলাই বাক্সের মতাে এক এক টুকরাে
রুটি, প্রত্যেকটা গুড়াে পর্যন্ত একেবারে গােনাগুন্তি, আর চর্বি সে
তাে বুঝতেই পারছ, কেবল ঠোঁটে ঠেকানাে আর কি। তবে
ভাগ করা হল এমন করে
যে কারাে নালিশ করার কিছু রইল না। কিছু দিনের মধ্যেই আমাদের মধ্যেকার শক্তসমর্থ দেখে শ'তিনেক লােককে
পাঠান হল জলা জমির
নিকাশের জন্যে, তারপর রুর এলাকায় খনিতে। চুয়াল্লিশ সাল পর্যন্ত সেখানেই ছিলাম। ততদিনে আমাদের লােকেরা জার্মানদের বেশ দু'চার ঘা
দিয়েছে, বন্দীদের নিয়ে অমন নাক সিটকানাে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল ফ্যাশিস্টদের।
একবার
আমাদের দিনের শিফটের সবাইকে সারবন্দী করা হল, কী এক ওবের-লেফটন্যান্ট এসেছিল, দোভাষী মারফত বললে, “যারা সৈন্যদলে অথবা যুদ্ধের আগে মােটর ড্রাইভার হিসাবে কাজ করেছে - তারা এক কদম এগােও!”
এগিয়ে গেলাম আমরা জন সাতেক লােক,
আগে যারা ড্রাইভারি করতাম। আমাদের কতকগুলাে পুরনাে ওভারঅল দিলে, সৈন্য পাহারায় পাঠালে পটসডাম শহরে।
সেখানে
পৌঁছতেই আমাদের সবাইকে নানান জায়গায়। ছড়িয়ে দেওয়া হল। আমার কাজ হল “তদৎ’-এ – এটা হল জার্মানদের রাস্তা
পাতা আর লড়াইয়ের নানা
রকম গাঁথনি টাথনির কাজ চালাবার একটা দপ্তর।
আমি
চালাতাম এক জার্মান ইঞ্জিনিয়রের
“ওপেল অ্যাডমিরাল” গাড়ি। পদে সে মেজর — আর
মটকো ছিল কী ফ্যাশিস্টটা! বে'টে, ভুড়িওয়ালা, লম্বায় চওড়ায় সমান, গিন্নিবান্নি মাগীর মতাে পাছা। সামনে কলারের ওপর তিন থাক থুতনি আর পেছনে ঘাড়ের
ওপর তিনটে মােটা মােটা ভাঁজ। আমার ধারণা, গতরে মণ খানেক চর্বি।
হাঁটে আর ফসফস করে
ইঞ্জিনের মতাে, খেতে বসলে গতর সামলে রাখাই দায়। সারা দিনই মুখ চলছে, ফ্লাস্ক থেকে টুকটুক কনিয়াক টানছে। মাঝে মধ্যে আমার ভাগ্যেও জুটত: রাস্তায় থেমে সসেজ আর পনীর কাটতে
থাকে, খায় দায়, মদ টানে; মেজাজ
ভালাে থাকলে আমার দিকেও দু এক টুকরাে
ছুড়ে দিত কুকুরের মতাে। কখনাে হাতে তুলে দিত না, ভাবত এতে তার মান যাবে। যাই হােক, বন্দী ছাউনির সঙ্গে তুলনাই হয় না, একটু একটু করে মানুষের মতাে দেখাতে লাগল আমায়, অল্প হলেও গায়ে মাংস লাগতে লাগল। হপ্তা দুয়েক আমি মেজরকে নিয়ে পটসডাম থেকে বার্লিন আর বার্লিন থেকে
পটসডাম করে বেড়ালাম, তারপর মেজর বদলি হল ফ্রন্ট এলাকার
কাছে, আমাদের বিরুদ্ধে গড়খাই গড়ার কাজে। এখানে আমার ঘুম একেবারে গেল : সারা রাত ধরে ভাবতাম, কী করে পালাই
নিজেদের লােকেদের কাছে, নিজের দেশে।
এলাম
আমরা পলােৎস্ক শহরে। ভােরবেলায় দুবছরের মধ্যে এই প্রথম কানে
শুনলাম আমাদের কামানের ডাক আর বুক যে
কেমন ঢিপঢিপ করে উঠেছিল যদি জানতে ভায়া, বিয়ের আগে ইরিনার সঙ্গে যখন দেখা করতে যেতাম তখনাে এমন হয়নি! লড়াই তখন চলছিল পলােৎস্কের পুবে আঠারাে কিলােমিটার দূরে। শহরের জার্মানদের মেজাজ হয়ে উঠল মারমাে, তিরিক্ষি, আর আমার মুটকোটির
শুরু হল আরাে ঘন
ঘন মদ-টানা। দিনে
যেতাম শহরের বাইরে, মেজর হকুম দিয়ে বেড়াত কী ভাবে ঘাঁটি
বানাতে হবে, আর রাতে একা
একা মদ টানত। একেবারে
ফুলে ফুলে চেহারা হল, চোখের তলে থলথল করত চামড়া ...
ভাবলাম,
“আর সবুর করার কিছু নেই, এবার আমার পালা এসেছে! তবে একলা যাব না, মটকোটাকেও সঙ্গে নিয়ে যাব, কাজে লাগবে।”
ভাঙচুরের
মধ্যে থেকে দুই-সেরী একটা লােহা জোগাড় করলাম, ন্যাকড়া দিয়ে সেটা জড়ালাম, যদি বাড়ি মারতে হয় তাহলে যেন রক্ত না বেরয়। টেলিফোনের
একটা তারও পথ থেকে তুলে
নিয়েছিলাম, যা দরকার সবই
একেবারে পাকাপাকি জোগাড় করে সামনের সিটের নিচে রেখে দিলাম। জার্মানদের যেদিন বিদায় জানিয়ে পালাই তার দুদিন আগে গাড়িতে তেল ভরে ফিরছি, দেখি এক মাতাল যাচ্ছে,
জার্মান হাবিলদার – একেবারে পাঁড় বদ, দেয়াল ধরে ধরে এগুচ্ছে। গাড়ি থামিয়ে ওকে নিয়ে গেলাম ভাঙা ঘরবাড়ির মধ্যে, গা থেকে উর্দি
আর মাথা থেকে টুপি ছিনিয়ে নিলাম। এ সম্পত্তিটাও সিটের
নিচে লুকিয়ে তৈরি হলাম।
উনত্রিশে
জুন সকালবেলায় মেজর হুকুম দিলে, নিয়ে যেতে হবে শহরের বাইরে এসনিৎসার দিকে। সেখানে ঘাঁটি গড়ার কাজকর্ম দেখছিল সে। চললাম। পেছনের সিটে বসে। মেজর নিশ্চিন্তে ঝিমুচ্ছে, আর আমার বুকের
মধ্যে তখন শুরু হয়েছে ধড়াস ধড়াস। গাড়ি চালালাম বেশ জোরে, কিন্তু শহরের বাইরে গিয়ে পীড কমিয়ে দিলাম। তারপর গাড়ি থামিয়ে নেমে তাকিয়ে দেখলাম চারিদিকে: পেছনে অনেক দুরে আসছে দুটো মাল বওয়া লরি। লােহাটা নিয়ে হাট করে দরজা খুললাম গাড়ির, মটকো সিটে হেলান দিয়ে দিব্যি নাক ডাকাচ্ছে, যেন বৌ নিয়েই শুয়েছে
শালা। লোহাটা নিয়ে বাড়ি মারলাম তার চাদির বাঁ দিকে। মাথাটি বুকের উপর ঢলে পড়ল, তারপর আর এক বাড়ি,
তবে একেবারে মেরে ফেলার ইচ্ছে হল না। ওকে
জ্যান্তই নিয়ে যাওয়া দরকার, আমাদের লােকেদের বেশ কিছ; খবর দিতে পারবে। খাপ থেকে “পারাবেলাম” পিস্তলটা নিয়ে পকেটে গুজলাম, পেছনের সিটের পেছন দিকে গুজলাম টায়ার খােলার হাতলটা, টেলিফোনের তারটা দিয়ে ওর গলা পেচিয়ে
বেধে রাখলাম সেই হাতলের সঙ্গে। তাড়াতাড়ি গাড়ি হাঁকিয়ে যাবার সময় এতে ও পাশে টলে
বা উলটে পড়বে না। তারপর সেই জার্মান উদি আর টুপিটি পরে
গাড়ি হাঁকালাম সােজা সেই দিকে, যেদিকে মাটি গরগর করছে, লড়াই চলছে যেখানে।
জার্মানদের
সামনের লাইন আমায় পেরুতে হয় দুদিকের দুই মেসিনগান-ঘাঁটির মাঝখান দিয়ে। ট্রেঞ্চের তল থেকে লাফিয়ে
উঠল একদল সাবমেসিনগানার, আমি ইচ্ছে করেই গাড়ির স্পীড কমিয়ে দিলাম, যাতে দেখতে পায় গাড়িতে আর কেউ নয়
মেজর বসে। ওরা কিন্তু হৈচৈ শুরু করে দিলে, হাত নাড়তে লাগল, মানে আর এগুনাে চলবে
না আর কি, তবে
আমিও ভাব করলাম যেন ওদের কথা বুঝতে পারছি না, স্পীড দিয়ে হাকালাম একেবারে ঘণ্টায় আশী কিলােমিটার। হুশ হয়ে ওরা যতক্ষণে গুলি চালাতে লেগেছে ততক্ষণে আমি চলে গেছি একেবারে দই ফ্রন্টের মাঝখানে,
গােলার গর্তগুলাের মধ্যে বাঁক নিয়ে নিয়ে এগুচ্ছি, তা খরগােসের চেয়ে
খারাপ নয়।
ওদিকে
পেছন থেকে গুলি চালাচ্ছে জার্মানরা, আমাদের লােকেরাও খেপে গিয়ে সামনে থেকে লাগালে সাবমেসিনগান। সামনের কাচটার চার জায়গায় ভাঙল, র্যাডিয়েটরটা গুলিতে ঝাঝরা করে দিলে ... ওদিকে একটা ঝিলের পাশে খানিকটা বন, সেখান থেকে আমাদের সৈন্যেরা ছুটে আসছে গাড়ির দিকে, আমিও গাড়ি চালালাম ওই বনের দিকেই,
দরজা খুলে মাটিতে পড়ে চুমু খেতে লাগলাম, নিঃশ্বাস নিতেও যেন পারছিলাম না... ছােকরা
মতাে একটা সৈন্য, উর্দির ওপর কেমন একটা খাকি শােল্ডার স্ট্র্যাপ, আগে তা কখনাে চোখেও
দেখিনি, সেই প্রথম ছুটে এল আমার কাছে,
দাঁত খিচিয়ে বলে, “আরে শালার জার্মান, পথ ভুল করে
বসেছিস নাকি?” জার্মান উর্দি টুপি খুলে পায়ে দলে বলি, “বাছা আমার, সােনার ছেলে আমার, জার্মান কোথায় রে, ভরােনেজে আমার বাড়ি, বন্দী ছিলাম, বুঝেছিস? এবার ওই গাড়িতে যে
মটকো শুয়ােরটা বসে আছে তার বাঁধন খােল, পাের্টফোলিও ব্যাগটা নে, আর আমায় নিয়ে
চল তােদের কম্যান্ডারের কাছে।”
পিস্তলটা
ওদের দিয়ে দিলাম, তারপর নানা হাত ফেরতা হয়ে সন্ধ্যের দিকে হাজির হলাম ডিভিসনের কম্যান্ডার, কর্নেলের কাছে। তার মধ্যেই খাইয়েছে আমায়, চান করিয়েছে, জিজ্ঞেসাবাদ করেছে, উর্দি দিয়েছে, তাই কর্নেলের গড়খাইয়ে হাজির হলাম উচিত মতাে পুরাে সাজ করে, দেহে মনে একেবারে পরিষ্কার পরিপাটী। চেয়ার ছেড়ে উঠে কর্নেল এগিয়ে এল আমার দিকে,
সমস্ত অফিসারদের সামনে আমায় জড়িয়ে ধরে বলে, “ধন্যবাদ তােকে জওয়ান! জার্মানদের কাছ থেকে যে দামী ভেট
এনেছিস তার জন্যে ধন্যবাদ। তাের জার্মান আর তার পাের্টফোলিওটা
আমাদের কাছে বিশটা বন্দীর চেয়েও দামী। তাের জন্যে পুরস্কারের সুপারিশ করে ওপরে লিখে পাঠাব।” তার এই কথা শুনে,
এই আদর আপ্যায়নে আমি তাে একেবারে বেসামাল, ঠোঁট কাঁপছে থরথর করে, বাগ মানছে না, কোনাে রকমে বললাম, “আমায় একটা পদাতিক ইউনিটে বহাল করে নিন, কমরেড কর্নেল।”
কর্নেল
হাসল, পিঠ চাপড়িয়ে বললে, “পায়ের ওপর দাঁড়িয়েই থাকতে পারছিস না তাে লড়াই
করবি কী? আজ তােকে পাঠাব
হাসপাতালে। সেখানে সেরে ওঠ, মাংস লাগুক, তারপর এক মাসের ছুটিতে
বাড়ি যাবি, যখন ফিরবি তখন দেখা যাবে কোথায় ভর্তি করব।”।
আর
কর্নেল, আর গড়খাইয়ে যত
অফিসার ছিল সবাই খুব দিল খুলে হ্যান্ডশেক করে বিদায় দিলে আমায়, বেরিয়ে এলাম একেবারে বেসামাল হয়ে, দুবছর তাে আর মানুষের মতাে
ব্যবহার পাইনি। আরাে মজা দ্যাখাে ভায়া, ওপরওয়ালার সঙ্গে কথা বলতে হলে এর পরেও অনেকদিন
অভ্যেস মতাে মাথাটা কেমন ঘাড়ের ওপর গুটিয়ে আসতে চাইত, চুপ মেরে বসে এমনি একটা ভয় যেন থেকেই গিয়েছিল। ফ্যাশিস্ট বন্দী-ছাউনিতে কী না বানিয়ে
তুলেছিল আমাদের ...
হাসপাতালে
গিয়েই চিঠি লিখলাম ইরিনাকে। লিখলাম খুবই কম, ছাউনিতে কেমন ছিলাম, জার্মান মেজরকে নিয়ে কী ভাবে পালিয়ে
আসি। আর দ্যাখাে দিকি,
কোথা থেকে যে ঐ ছেলেমানুষী
বড়াইটা এল কে জানে।
কিছুতেই পারলাম জানিয়ে দিলাম কর্নেল আমায় পুরস্কার দেবে বলেছে ..
দুসপ্তাহ
ঘুমােলাম আর খেলাম। খাওয়া
দিত অল্প করে, কিন্তু ঘনঘন, নইলে, ডাক্তার বললে : যত গিলতে পারি
তত খাবার দিলে আমি নাকি টেসে যেতে পারতাম। তা বেশ শক্তসমর্থ
হয়ে উঠলাম, কিন্তু দুসপ্তাহ পরে আর খাবার দুতেও
পারতাম না। বাড়ি থেকে জবাব নেই, মন আমার বাড়ির
জন্যে কাঁদত তা স্বীকারই করছি।
খাবার কথা মনেও আসত না, ঘুম গেল, মাথার মধ্যে কেবল যত রাজ্যের দুর্ভাবনা
... তৃতীয় সপ্তাহে ভরােনেজ থেকে চিঠি পেলাম। কিন্তু ইরিনার লেখা নয়, আমার প্রতিবেশী ছততার ইভান তিমােফেয়েভিচের। ভগবান করুন অমন চিঠি যেন কেউ না পায়। চিঠিতে
লিখেছে, বিয়াল্লিশ সালের জুন মাসেই জার্মানরা এরােপ্লেন কারখানাটায় বােমা ফেলে, একটা ভারি বােমা পড়ে একেবারে আমাদের বাড়িটাতেই। ইরিনা আর মেয়েদুটো সে
সময় ঘরেই ছিল ... লিখেছে, তাদের কোনাে চিহু পায়নি, বাড়িটা যেখানে ছিল, সেখানে শুধু একটা মস্ত খাদ ... এবার আর শেষ পর্যন্ত
চিঠিটা পড়া হল না। চোখ
অন্ধকার হয়ে এল, বুকের ভেতরটা হয়ে গেল যেন একটা জমাট পাথর, কিছুতেই হালকা আর হয় না।
চিত হয়ে শুলাম, খানিকটা দম নিয়ে শেষ
পর্যন্ত পড়লাম। লিখেছে, বােমা পড়ার সময় আনাতলি ছিল শহরে, সন্ধ্যেয় ফিরে আসে, দেখে বােমার গর্তটা। তারপর রাতেই ফের শহরে ফিরে যায়। পাড়ার লােককে বলে যায় ফ্রন্টে স্বেচ্ছাসেবক হবার জন্যে দরখাস্ত দেবে। এই হল খবর।
যখন
বুকটা খানিকটা নরম হল, শিরায় রক্ত ছােটার শব্দ শােনা গেল কানে, তখন মনে পড়ল স্টেশনে বিদায় দেবার। সময় কী রকম কষ্ট
হয়েছিল ইরিনার। মানে তখনই তার মেয়েলী মন টের পেয়েছিল
এ দুনিয়ায় আর আমার সঙ্গে
দেখা হবে না। অথচ আমি তাকে তখন ঠেলে দিয়েছিলাম ... সংসার ছিল, বাড়ি ছিল নিজের, কত বছর ধরে
গড়ে উঠেছিল সব, আর ছারখার হয়ে
গেল এক পলকেই, রইলাম
আমি একা। মনে হল; “আমার এই বিদঘুটে জীবনটা
সবই স্বপ্ন নয়ত ?” বন্দী থাকার সময় প্রায় প্রতিটি রাতেই - মনে মনে অবশ্যি – কথা কয়েছি ইরিনার সঙ্গে, ছেলেমেয়েদের সঙ্গে, সান্ত্বনা দিয়েছি, দ্যাখাে না, এই ফিরে আসছি
বলে, আমার জন্যে ভাবনা করাে না, শক্ত জান আমার, ঠিক বেঁচে থাকব, ফের একসঙ্গে মিলব সবাই ... তার মানে, দুবছর এই যে কত
কথা কইলাম তা সব মরা
মানুষের সঙ্গে ?! | লোেকটা এক মিনিট চুপ
করে রইল, তারপর অন্য কেমন একটা বদলে যাওয়া মদ, গলায় বললে : নাও একটু সিগারেট খেয়ে নেওয়া যাক ভায়া, নয়ত বুকের মধ্যে কেমন চাপ লাগছে।
সিগারেট
ধরালাম আমরা। গলে যাওয়া বরফ-জলের মধ্যে বনে সশব্দে ঠকঠকিয়ে উঠল একটা কাঠঠোকরা। তেমনি আলস্যেই উষ্ণ বাতাস নাড়া দিয়ে চলেছে অ্যালডারের শুকনাে পাতায় ; নীলের উচুতে তেমনি করেই টানটান শাদা পালের মতাে ভেসে চলেছে মেঘ, কিন্তু বসন্তের মহা সাধনের জন্য উন্মুখ, জীবনের ক্ষেত্রে জীবন্তের চিরন্তন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তুত সীমাহীন বিশ্বটাকে কেমন অন্যরকম লাগল এই শােকাতুর নৈরব্যের
মুহুর্তগুলিতে।
চুপ
করে থাকতে কষ্ট হচ্ছিল। জিজ্ঞেস করলাম : ‘তারপর?
“তারপর
?” অনিচ্ছায় সাড়া দিলে লােকটা, তারপর কর্নেলের কাছ থেকে এক মাসের ছুটি
পেলাম, এক সপ্তাহের মধ্যেই
পৌছলাম ভরােনেজে। পায়ে হেটে পৌছলাম সেই জায়গাটায়, যেখানে এক সময় সংসার
পেতেছিলাম। মস্ত একটা গত, মরচে রঙা জল জমেছে, চারিপাশে
কোমর পর্যন্ত আগাছা ... খাখা করছে, কবরের মতাে চুপচাপ। উহ, ভায়া, কী কষ্টই যে
লাগছিল! দাঁড়িয়ে রইলাম খানিক, মনে মনে শােক করলাম, তারপর ফিরে গেলাম স্টেশনে। এক ঘণ্টাও সেখানে
আর থাকতে পারছিলাম না, সেইদিন রওনা হলাম ডিভিসনে।
কিন্তু
মাস তিনেক পরে মেঘের আড়ালে সর্যির মতাে সুখের একটা ঝলক দেখলাম : খোঁজ মিলল আনাতলির। ফ্রন্টে চিঠি পাঠালে আমায়, বােঝেই তাে, অন্য একটা ফ্রন্ট থেকে। ঠিকানাটা পেয়েছিল সেই পড়শী ইভান তিমােফেয়েভিচের কাছ থেকে। প্রথমটায় ও ভর্তি হয়েছিল
গােলন্দাজ অফিসারদের ইশকুলে ; সেখানেই ওর অঙ্কের মাথাটা
কাজে লাগে। এক বছর পরে
সেরা নম্বর পেয়ে ইশকুল শেষ করে, ফ্রন্টে যায়, লিখেছে ক্যাপটেনের পদ মিলেছে, হালকা
কামানের এক ব্যাটারির কম্যান্ডার,
ছয়টা অর্ডার আর কয়েকটা মেডেল
পেয়েছে। মােট কথা, সব দিক থেকেই
ছাড়িয়ে গেছে বাপকে। ফের ভয়ানক গর্ব হল ওকে নিয়ে
! যাই বলাে, আমারই আপন ছেলে, ক্যাপটেন, ব্যাটারির কমান্ডার, যা-তা কথা
নয়। তাতে আবার অতগুলাে মেডেল। বাপ তার “স্টুডিবেকারে গােলাগুলি রসদপত্র বয়, তাতে কী এসে যায়
? বাপের দিন তাে গেছে, আর আমার এই
ক্যাপটেনটির গােটা ভবিষ্যৎটাই যে সামনে।
রাতে
আমার শুরু হল তােমার বুড়ােমানুষী
যত সাধ : যুদ্ধ শেষ হবে, ছেলের বিয়ে দেব, ওদের সঙ্গেই থাকব, ঘরের এটা ওটা বানাব, নাতিনাতনিদের দেখা শােনা করব। মানে, বড়াে মানুষের যত রকম সাধ
আর কি। কিন্তু সবই একেবারে ধুলিসাৎ হয়ে গেল। শীতকালে না থেমে সমানে
আক্রমণ চালান হল, তেমন ঘনঘন চিঠি লেখার সময় আর ছিল না,
আর যুদ্ধের শেষ দিকে, একেবারে বালিনের কাছেই সকালে চিঠি পাঠালাম আনাতলিকে, পরের দিনই জবাব পেলাম। বােঝা গেল, বাপ ছেলে আমরা দুজনেই জার্মান রাজধানীর দিকে এগিয়েছি ভিন্ন ভিন্ন পথে, কিন্তু এখন কাছাকাছিই এসে গেছি। সবুর আর সয় না,
কেবলি ভাবি কবে দেখা হবে। আর সে দেখাও
হল বটে ... ঠিক একেবারে ৯ই মে সকালে,
বিজয়ের দিনে আনাতলি আমার মারা পড়ে জার্মান স্নাইপারের গুলিতে ...
বিকেলের
দিকে আমায় ডেকে পাঠালে কম্পানির কম্যান্ডার। দেখি, তার কাছে বসে আছে অচেনা এক গােলন্দাজ অফিসার।
আমি ঘরে ঢুকতেই সে উঠে দাঁড়াল,
ওপরওয়ালা অফিসারের কাছে লােকে যেমন উঠে দাঁড়ায়। আমার কম্পানির কম্যান্ডার বললে, “তাের কাছে এসেছে, সকোলভ।” বলে জানলার দিকে মুখ ফিরিয়ে রইল। আমার শরীরের মধ্যে দিয়ে যেন একটা বিজলী খেলে গেল, অমঙ্গল টের পেলাম। অফিসারটি আমার কাছে এসে আস্তে আস্তে বললে, “বুক বাঁধে, বাপ! তােমার ছেলে ক্যাপটেন সকোলভ আজ ব্যাটারিতে মারা
গেছে। এসাে আমার সঙ্গে!”
টলতে
লাগলাম আমি, তবে পায়ের ওপর খাড়া হয়েই ছিলাম। এখনাে কেমন স্বপ্নের মতাে মনে হয়, অফিসারটির সঙ্গে মস্ত একটা গাড়িতে করে গেলাম ভাঙচুরে ভরা সব রাস্তা দিয়ে,
সৈনােরা সারবন্দী দাঁড়িয়ে আছে, লাল মখমলে ঢাকা কফিন, সবই কেমন ঝাপসা মনে পড়ে। কিন্তু আনাতলিকে একেবারে স্পষ্ট দেখতে পাই, ঠিক যেমন এই তােমায় দেখছি।
কফিনের
কাছে এলাম। শুয়ে আছে আমারই ছেলে, তব, আমার নয়। আমার ছেলেটার ছিল সর্বদাই হাসি মুখ, রােগা কাধ, সর, গলায় খোঁচাটে ডিম, আর এখন যে
শুয়ে আছে সে এক জোয়ান,
ভরাট-কাঁধ, সুন্দর এক মরদ, আধবােজা
চোখ, আমায় ছাড়িয়ে কোথায় যেন তাকিয়ে দেখছে অনেক দূরে। শুধ, ঠোঁটের কোণে আমার সেই আগের ছেলের হাসির আমেজটুকু থেকেই গেছে, সেই আনাতলির হাসি, যাকে একদিন চিনতাম আমি ... কপালে ওর চুম দিয়ে
সরে এলাম। অফিসরটি বক্তৃতা দিলে। আমার আনাতলির বন্ধুবান্ধব কমরেডরা সবাই চোখ মুছল কিন্তু আমার না-কাঁদা চোখের
জল বােধ হয় হৃৎপিণ্ডেই শুকিয়ে গিয়েছিল। সেইজন্যেই অমন ব্যথা করে হয়ত ?
রের
দেশে জার্মান মাটিতে কবর দিলাম আমার শেষ আনন্দ, শেষ আশার, তােপ দেগে তার কম্যান্ডারকে দুরের পথে বিদায় দিলে ব্যাটারি, আর আমার বুকের
মধ্যে কী একটা যেন
ছিড়ে গেল ... নিজের ইউনিটে ফিরে এলাম একেবারে অন্য মানুষ। শীগগিরই সৈন্যদল থেকে খালাস পেলাম। যাব কোথায়? ভরােনেজেই নাকি? কিছুতেই তা পারব না!
মনে পড়ল, উরপিন-এ আমার এক
বন্ধু আছে, শীতকালেই সৈন্যদল থেকে ছাড়া পেয়েছিল জখম বলে -- কবে যেন একবার সে আমায় নেমন্তন্ন
করে রেখেছিল -- মনে পড়তেই গেলাম উরপিনস্ক-এ। | আমার বন্ধ, আর বন্ধুর বৌ
নিঃসন্তান, থাকত শহরের কিনারে নিজেদেরই বাড়িতে। অকর্মণ্য গণ্য হয়ে ভাতা পেয়েছিল সে, তাহলেও লরি ডিপােয় ড্রাইভারি করত। আমাকেও সে কাজ জুটিয়ে
দিলে সেখানে। বন্ধুর ওখানেই রইলাম, আমার জন্যে ঠাঁই করে দিলে। নানা রকম মালপত্তর বইতাম লরিতে, শরতে ফসল বইবার কাজে পাঠালে। এই সময় আমার
নতুন ছেলেটির দেখা পাই, ওই যে যেটি
বালিতে খেলছে।
লম্বা
পাড়ি দিয়ে শহরে ফিরে প্রথম কাজ হত, বুঝতেই পারছ, চাখানায় গিয়ে যা হােক কিছু,
একটু খেয়ে নেওয়া, শ’গ্রাম ভােদকাও
অবিশ্যি থাকত। বদভ্যাসটা তখন বেশ রপ্ত করে নিয়েছি, তা মানছি ... চাখানার
পাশে দেখি ছেলেটা, একদিন দেখি, দু'দিন দেখি;
ক্ষদে ভূত একেবারে : মুখখানায় তরমুজের রস মাখা, ধুলােয়
ভরা, ভূতের মতাে নােংরা, চুলে চিরনি পড়ে না, আর চোখদুটি যেন
তােমার বৃষ্টির পর রাতের আকাশে
তারা! এমন ভালাে লেগে গেল যে অবাক কাণ্ড,
মন কেমন করত ওর জন্যে, কাজ
সেরে ফিরতাম তাড়াতাড়ি করে, ওকে দেখব বলে। চাখানাটার কাছেই ওর খাওয়া জুটত
– যে যা দিত আর
কি। | চার দিনের দিন রাষ্ট্রীয় খামার থেকে ফসল বােঝাই লরিসমেত সােজা বাঁক নিলাম চাখানাটার দিকে। ছেলেটি আমার বসে আছে দাওয়ায়, পা দোলাচ্ছে, দেখেই
বােঝা যায় পেটে কিছু পড়েনি। কেবিন থেকে মুখ বাড়িয়ে ডাকলাম, “এই ভানিয়া, চট
করে লরিতে এসে ওঠ, গুদামে মাল পৌছে ফিরে আসব এখানে, একসঙ্গে খাওয়া যাবে।” আমার ডাক শুনে চমকে উঠল ছেলেটা, তারপর দাওয়া থেকে নেমে পা-দানিতে লাফিয়ে
উঠে আস্তে করে বলে, “কোথেকে জানলেন কাকু আমার নাম ভানিয়া?” চোখ বড়াে বড়াে করে চেয়ে রইল, কী বলি! বললাম;
ওরে, আমি অনেক ঘাটের জল খাওয়া লােক,
সব জানি।
আমার
ডান দিক দিয়ে উঠল সে, দরজা খুলে পাশে বসালাম ওকে, রওনা দিলাম। অমন ছটফটে ছেলে, হঠাৎ কেমন শান্ত হয়ে গেল, কী যেন ভাবে
আর থেকে থেকে বড়ো বড়াে | চোখের পাতা তুলে আমার দিকে চায়, নিঃশ্বাস ফেলে। ওইটুকু ছেলে, এর মধ্যেই দীর্ঘ
নিঃশ্বাস ফেলতে শিখেছে। বলাে দেখি, একি ওর সাজে ? জিজ্ঞেস
করলাম, “তাের বাপ কোথায় রে ভানিয়া?” ফিসফিস
করে বললে, “ফ্রন্টে মারা গেছে।” “আর মা?” “ট্রেনে
করে যখন যাচ্ছিলাম, তখন বােমা পড়ে মা মারা যায়।”
“আসছিলি কোথেকে?” “জানি না, মনে নেই ...” “তাের আপনার লােক কেউ নেই এখানে?” “কেউ নেই।” “রাতে থাকিস কোথায় ?” “যেখানে জোটে।” বুকের মধ্যে কেমন একটা কান্না উথলে উঠল আমার, তক্ষুণি ঠিক করলাম: “এমন একা একা ভােগান্তি আমাদের চলবে না। ওকে পােষ্য নেব।” সঙ্গে সঙ্গেই বুকের ভেতরটা আমার কেমন হালকা লাগল, আলাে হয়ে উঠল। ওর দিকে ফিরে
আস্তে করে বললাম, “আর আমি কে
তা তুই জানিস,
ভানিয়া ?” ও
নিশ্বাস ফেলার মতাে করে বললে, “কে?” আমিও তেমনি আস্তে করেই বললাম, “আমিই তাের বাবা।”
অমনি
সে কী কাণ্ড, বাপ
রে! একেবারে আমার গলা জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে লাগলে আমার ঠোটে গালে কপালে, সর, রিনরিনে গলায় পাখির মতাে এমন চেঁচাতে লাগল যে কানে তালা
লাগার জোগাড়, “আমি ঠিক জানতাম, বাবা! ঠিক জানতাম তুমি আমায় খুঁজে বার করবে! শেষ পর্যন্ত খুজে পাবেই! খোঁজ পেয়ে কবে আসবে তার জন্যে কতদিন থেকে বসে আছি !” আমার গায়ে গা ঘেষে কাঁপছে
যেন ঝড়ের পাতার মতাে। আমারও ওদিকে চোখ ঝাপসা, সারা গা শিউরে উঠছে,
হাত কাঁপছে ... স্টিয়ারিং হুইলটা কেমন করে যে ধরেছিলাম ভগবানই
জানেন। তাহলেও আচমকা রাস্তার পাশের নালার মধ্যে পড়ে ইঞ্জিন থামিয়ে দিলাম। চোখের কুয়াসাটা না কাটা পর্যন্ত
গাড়ি চালাতে ভয় হল, কাউকে হয়ত চাপা দিয়ে বসব। মিনিট পাঁচেক অমনি রইলাম, ছেলে আমার প্রাণপণে আমায় আকড়ে ধরেছে, মুখে কথা নেই, কেবলি কাপছে। ডান হাত দিয়ে ওকে কাছে টেনে নিয়ে বাঁ হাত দিয়ে গাড়ি ঘােরালাম, ফিরে গেলাম নিজের বাসায়। কে আর তখন
যায় গুদামে, গুদামে যাবার অবস্থা তখন আমার নেই।
দুয়ােরের
কাছে গাড়িটা রেখে আমার নতুন ব্যাটাকে কোলে করে ঘরে নিয়ে এলাম। আর ওই-যে
আমার গলা জড়িয়ে ধরেছিল, সে আর ছাড়েনি।
আমার না-কামানাে গালে
গাল দিয়ে এটে রইল। ওই ভাবেই নিয়ে
এলাম। বাড়ির কর্তা গিন্নি ঠিক সেই সময়টিতেই ঘরে ছিল। এসে ওদের দিকে চোখ মটকে ফুর্তি করে বললাম, “দ্যাখাে, আমার ভানিয়াকে খুঁজে পেয়েছি। বরণ করাে গাে ভালােমানুষেরা !” দুটিতে ওরা নিঃসন্তান, চট করেই বুঝে
নিলে ব্যাপার কী, ব্যস্তসমস্ত হয়ে ছােছুটি লাগাল। আমি কিন্তু ছেলের হাত আর ছাড়াতে পারি
না।
যাই
হােক, বুঝিয়ে সুজিয়ে নামালাম। সাবান দিয়ে হাত মুখ ধুয়ে দিলাম, খেতে বসালাম। গিন্নি এক প্লেট স্যুপ
ঢেলে দিলে, যে রকম গােগ্রাসে
খেতে লাগল ছেলেটা তা দেখেই চোখ
দিয়ে জল পড়তে লাগল
তার। চুল্লির কাছে দাঁড়িয়ে কাঁদতে লাগল একা একা। ভানিয়ার চোখে পড়ল কাঁদছে। কাছে গিয়ে খুট ধরে বলে কি, “কাঁদছ কেন কাকী, বাবা আমায় খুঁজে পেয়েছে চাখানাটার কাছে, সবাই মিলে আনন্দ করবে, না কাঁদছ।” আর
তা শুনে দ্যাখাে দিকি, আরাে উথলে উঠল গিন্নির কান্না, একেবারে কেঁদে ভাসিয়ে দিলে।
খাওয়ার
পর ওকে নিয়ে গেলাম সেলুনে, চুল ছাঁটা হল, বাড়ি এসে নিজের হাতে তাকে চান করালাম, পরিষ্কার চাদরে জড়িয়ে দিলাম। আমার গলা জড়িয়ে ধরে কোলের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল। সাবধানে বিছানায় শুইয়ে আমি গেলাম গুদামে, মাল খালাস করে গাড়ি রেখে ছুটলাম দোকানে। সার্জের ট্রাউজার কিনলাম ওর জন্যে, জামা,
স্যান্ডাল, টুপি কিনলাম। বােঝােই তাে কিছুই ঠিক মাপসই হল না, জিনিসগুলােও
বাজে। ট্রাউজারটা দেখে গিন্নি তাে একেবারে বকুনিই শুরু করে দিলে। বলে, “তােমার মাথা খারাপ হয়েছে, এমন গরমে কিনা ছেলের জন্যে সার্জের প্যান্ট!” বলেই সঙ্গে সঙ্গেই সেলাই কল নিয়ে বসল,
তােরঙ্গ টোরঙ্গ হাতড়ালে, ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই আমার ভানিয়ার জন্যে তৈরি হয়ে গেল একটি শাটিনের ইজের আর শাদা একটি
হাফ শার্ট। ওর সঙ্গেই শুলাম
আমি, অনেক দিন পরে সেই প্রথম আবার শান্তিতে ঘুমালাম। বার চারেক অবিশ্যি উঠেছিলাম। ঘুম ভেঙে যায়, দেখি আমার বুকের কাছে গুটিসুটি হয়ে আছে চড়ুইয়ের মতাে, আস্তে আস্তে নিঃশ্বাস ফেলছে। মনের ভেতর আমার তখন কী যে সখ
সে বলা যায় না! নড়তে ভয় হয় পাছে জেগে যায়, তাহলেও চুপিচুপি উঠে দেশলাই জেলে চেয়ে চেয়ে দেখি ...
ভােরের
আগে ঘুম ভেঙে বুঝতে পারছিলাম না অমন নিঃশ্বাস
বন্ধ হয়ে আসছে কেন। দেখি কি, ছেলেটি আমার বিছানা ছেড়ে উঠে এসেছে আমার বুকের ওপর, পা তুলে দিয়েছে
আমার গলায়। ওর সঙ্গে ঘুমােয়
অশান্তি বাপ, কম নয়, কিন্তু
অভ্যেস হয়ে গেছে, ও নইলে খাঁখাঁ
করে মন। রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় হাত বুলিয়ে দিই গায়ে, ঝাঁকড়া চুলগুলাের গন্ধ শকি - আর বুকের ভার
নেমে যায়, মন নরম হয়ে
আসে, বুকটা আমার যে পাথর হয়ে
উঠেছে, সে তাে শােকে
দুঃখেই ...
প্রথম
প্রথম আমার সঙ্গেই সে যেত লরিতে।
পরে বুঝলাম, এভাবে চলে না। একলা আমার আর কী দরকার?
একটুকরাে রুটি, একটা পেঁয়াজ আর নুন - বাস,
সারা দিনের মতাে ওতেই সৈনিকের চলে যাবে। কিন্তু ওর কথা যে
আলাদা : দুধ চাই রে, ডিম সেদ্ধ করে রে, রান্নাবান্না নইলে তাে চলে না। অথচ আমার কাজও আর ফেলে রাখা
যায় না। যাই হােক, বুক বেধে ওকে রেখে গেলাম বাড়ির গিন্নির কাছে, সন্ধ্যে পর্যন্ত সেখানেই কেঁদে কেঁদে মরে, সন্ধ্যে হতেই চলে আসে গুদামে, রাত পর্যন্ত বসে থাকে আমার পথ চেয়ে। | প্রথম
দিকটা ভারি মুশকিল হয়েছিল ওকে নিয়ে। একবার দিনে খুব হয়রানি গিয়েছিল, সকাল সকাল শুতে গেছি, আর ছেলেটা -- মুখে
তার অনবরত খই ফুটেছে, সেদিন
কিন্তু কেমন চুপচাপ। জিজ্ঞেস করলাম, “কী রে, কী
ভাবছিস ?” কড়িকাঠের দিকে চেয়ে চেয়ে ও বলে, “আচ্ছা
বাবা, তােমার চামড়ার সেই ওভারকোটটা কোথায় ?” চামড়ার ওভারকোট আমার জীবনে কখনাে ছিল না। ধোঁকা দিতে হল। বললাম, “ভরােনেজে হারিয়ে গেছে।” “আর আমায় খুঁজতে
তােমার অত দেরি হল
যে বাবা?” বলি, “কত খুঁজতে হয়েছে
যে, জার্মানিতে খুজেছি, পােলাণ্ডে খুঁজেছি, সারা বেলােরুশিয়া পেরিয়ে এসে তােকে খুঁজে পেলাম এই উরপিনস্কে।” “উরপিনস্ক
জার্মানির কাছে বুঝি? আর পােলান্ড এখান
থেকে অনেক দর, না?” এমনি করেই আলাপ চলে ঘুমের আগে। | কী ভেবেছ, চামড়ার
ওভারকোটের কথাটা কি আর ও
এমনি এমনি তুলেছে ? উহ, মােটে অত সহজ নয়।
তার মানে ওর আসল বাপ
এক সময় নিশ্চয় চামড়ার কোট পরত সেইটে মনে পড়ে গেছে আর কি। ছেলেদের
মন সে যে গ্রীষ্মের
বিজলীর মতাে; বালক দিয়ে উঠল, খানিকটায় আলাে পড়ল, বাস, নিভে গেল। ওর স্মৃতিটাও তাই,
বিদ্যুতের মতাে ঝলকে ঝলকে ওঠে।
উরপিনস্ক
শহরে আরাে বছর খানেক হয়ত এক সঙ্গেই কাটত,
কিন্তু নভেম্বরে একটা পাপকম্ম করে বসেছিলাম : যাচ্ছিলাম কাদার মধ্যে দিয়ে, একটা গাঁয়ে গাড়িটা আমার স্কিড করে, একটা গরু পড়েছিল সামনে, ধাক্কা লেগে পড়ে যায় গরুটা। আর জানােই তাে
ব্যাপার, মাগীগুলাে চেচামেচি লাগালে, ছুটে এল লােকজন, ট্রাফিক
ইনস্পেকটরও একেবারে হাজির। আমার ড্রাইভার লাইসেন্সটি কেড়ে নিলে, কত কাকুতি-মিনতি
করে বললাম, কিছুই হল না। গরটা
ওদিকে উঠে দাঁড়িয়ে লেজ তুলে ছুট লাগালে রাস্তা দিয়ে, আমি কিন্তু আমার লাইসেন্সটি হারালাম। শীতকালে ছুতােরের কাজ করে চালালাম, তারপর চিঠি লিখি আমার এক বন্ধুকে - সেও
একই ফ্রন্টে ছিল আমার সঙ্গে – তােমাদের এই এলাকারই লােক,
কাশারি জেলায় ড্রাইভারি করে, আমায় যেতে বলেছে ওর কাছে। লিখেছে,
মাস ছয়েক ছুতােরি করে চালাবি, তারপর আমাদের নতুন লাইসেন্স করিয়ে নিবি। তাই ছেলের সঙ্গে মার্চ করে চলেছি কাশারিতে।
তবে
এও বলি, গরুটা নিয়ে ওই হাঙ্গামাটা যদি
নাও ঘটত, তাহলেও উরপিনস্কে আমি থাকতাম না। মন খাঁখাঁ করে,
এক জায়গায় বেশি দিন থাকতে দেয় না। আমার ভানিয়া যখন বড়াে হয়ে উঠবে, ইশকুলে ভর্তি করার সময় হবে, তখন হয়ত খানিক স্থির হয়ে স্থিতু হয়ে বসব। তবে এখন এই ওকে নিয়েই
হে'টে বেড়াচ্ছি বুশ
দেশ।
বললাম,
“হাঁটতে কষ্ট হয় না ওর?”
‘তা
নিজের পায়ে ও হাঁটে কম,
আমার ঘাড়ে চেপেই যায় বেশি। কাঁধে তুলে নিয়ে রওনা দিই, আড়িমড়ি ভাঙার ইচ্ছে হলে কাঁধ থেকে নেমে রাস্তার পাশ ধরে দৌড়য়, ছাগলছানার মতাে লাফালাফি করে। এসব কিছু নয় ভায়া, যাই হােক, পালিয়ে যাব ঠিকই, শুধু এই বুকটা কেমন
ধড়ফড় করে, ইঞ্জিনের পিস্টনটা বদলানাে দরকার আর কি... মাঝে
মাঝে এমন চেপে ধরে মােচড় দেয় যে চোখে অন্ধকার
দেখি। ভয় হয় ঘুমের মধ্যেই একদিন হয়ত মরে থাকব, অতিকে যাবে ছেলেটা। আরাে এক বিপদ দ্যাখাে
: প্রায় রােজ রাতেই আমার মরা ছেলেমেয়ে বৌকে স্বপ্নে দেখি। বেশির ভাগ স্বপ্নেই আমি যেন কাঁটা তারের বেড়ায় বন্দী, ওরা তার ওপাশে স্বাধীন ... সকলের সঙ্গেই কথা বলি, ইরিনার সঙ্গে, ছেলেমেয়েদের সঙ্গে, কিন্তু কাঁটা তারগুলাে দুহাতে যেই ছিড়তে যাই, অমনি সবাই সরে পড়ে, হঠাৎ যেন মিলিয়ে যায় ... অবাক কাণ্ড বটে : দিনে বেশ ঠিক থাকি, “উহ, আহ” কিছুই নয়, তবে রাত্রে ঘুম ভেঙে যায় মাঝে মাঝে, কান্নায় বালিশ একেবারে ভিজে ওঠে..
গাছপালার
ভেতর থেকে শােনা গেল আমার সঙ্গীর গলা, জলে দাঁড়ের ছপছপ।
অচেনা
লােকটা ইতিমধ্যে কেমন আপন হয়ে উঠেছে আমার, উঠে দাঁড়িয়ে চ্যাটালাে, কাঠের মতাে শক্ত হাত বাড়িয়ে দিলে সে। ‘চললাম ভায়া, যাত্রা শুভ হােক! তােমার জন্যেও শুভ যাত্রা। ধন্যবাদ। ওরে ছেলে, চল এবার নৌকোয়।
ছেলেটা
ছুটে এল বাপের কাছে,
ডান পাশে গিয়ে বাপের কোর্তার ঝুলটা ধরে তার বড়াে বড়াে পদক্ষেপের সঙ্গে তাল রেখে ছুটতে লাগল।
যুদ্ধের
এক উদ্দাম ঝড়ে নিক্ষিপ্ত ঘরছাড়া দুটি নিঃসঙ্গ মানুষ, দুটি বাল, কণা ... কী আছে ওদের
ভবিষ্যতে? ভাবতে ভালাে লাগল যে, এই শী লােকটা,
অনমনীয় ইচ্ছাশক্তির এই মানুষটা ভেঙে
পড়বে না কিছুতেই, বাপের
কাঁধের কাছে বেড়ে উঠবে তার ছেলেটি, আর স্বদেশের ডাক
পড়লে সবকিছু সয়ে যাবার, পথের সব বাধা অতিক্রম
করার সামর্থ্যে সে পিছবে না।
গভীর
বিষাদে আমি তাকিয়ে রইলাম ওদের গমন পথের দিকে ... হয়ত আমাদের এই বিদায়টা ভালােয়
ভালােয়ই। কেটে যেত, কিন্তু কয়েক পা এগুবার পর
ভানিয়া চলতে চলতেই তার ক্ষুদে ক্ষুদে পায়ের ওপর বেঁকে মুখ ফেরালে আমার দিকে, ছােট্ট গােলাপী হাতটা নাড়ালে। অমনি হঠাৎ একটা নরম কিন্তু নখরভরা থাবায় যেন বুকের ভেতরটা চেপে ধরল আমার, মুখ ফিরিয়ে নিলাম তাড়াতাড়ি। না, যুদ্ধের মধ্যে চুল পেকে যাওয়া বয়স্ক মরদরা শুধু, ঘুমের মধ্যেই কাঁদে তা নয়। দিনেও
কাঁদে। ঠিক সময়ে মুখ ঘুরিয়ে নিতে পারাটাই আসল কথা। আসল কথা হল শিশুর বুকটা
জখম না করা, সে
যেন দেখতে না পায় গাল
বেয়ে তােমার গড়িয়ে পড়ছে কোন জালাময় কৃপণ এক পুরুষালী অশ্র,
...