----জসিম
উদ্দিন
বনের
মধ্যে দুইঘর শেয়াল। পাশাপাশি বাস করে। ও-বাড়ির শেয়াল
রােজ রাতে মােরগ, মুরগি, হাঁস, কবুতর চুরি করিয়া আনে। শেয়ালনি সেগুলাে টুকরাে করিয়া দাঁত দিয়া চিরিয়া তার ছেলেমেয়েদের খাওয়ায়, নিজেরাও কতক খায়, কতক ফেলায় ।। খাইয়া দাইয়া
এ-বাড়ি ও-বাড়ি যাইয়া
গুমর করিয়া কথা কয় । তাদের গায়ে
তেল চকচক করে। শেয়ালনি গুমরে মাটিতে পা ফেলায় না।
শানকুনি সাপের চামের জামা পরিয়া, শামুকের মালা। গলায় পরিয়া শেয়ালনি বন ভরিয়া ঘােরে।
আর এ-বাড়ির শেয়াল
কিছুই আনিতে পারে না। মাঝে মাঝে মাঠ হইতে মরা গরুর শুকনাে ঠ্যাং, মাছের কাটা আর ছাগ। বকরির
হাড় কুড়াইয়া লইয়া আসে। তা কি দাঁতে
ভাঙা যায় ? তাই খাইয়া শেয়াল আর শেয়ালনি কোনােরকমে
জীবন ধারণ করে। ছােট ছােট বাচ্চাগুলি সেই শুকনাে হাড়গোড়রও খাইতে পারে না। না খাইয়া তাহারা
শুকাইয়া পাটখড়ি হইয়া গিয়াছে। দিনরাত খাবার দাও, খাবার দাও বলিয়া মায়ের শুকনাে স্তন চাটিতে থাকে। সেই স্তনেও কি দুধ আছে
? না । না খাইয়া
শেয়ালনির স্তনের দুধও শুকাইয়া গিয়াছে ।
সেদিন
বাচ্চাদের কান্নায় থাকিতে না পারিয়া শেয়ালনি
শেয়ালকে বলিল, “তুমি একেবারে অকস্মা। ও-বাড়ির শেয়াল
রােজ রাত্রে গেরস্তবাড়ি হইতে কত হাঁস মুরগি
লইয়া আসে ।
তুমি
আন শুধু মরা গরুর শুকনাে হাড়। হাঁস মুরগি চোখে | দেখিতে পাও না?"
শেয়াল
বলিল, “শেয়ালনি ! তুমি রাগ করিও না। আমি ত সারারাত চেষ্টা
করি। গেরস্তবাড়ি গেলেই তাদের কুকুরটা আমার উপর তাড়িয়া আসে। কি করিয়া হাঁস
মুরগি আনিব ?” কথাটা ত সত্যই। শেয়ালনি
কিছুক্ষণ ভাবিয়া বলিল, “তুমি যাও- ও-বাড়ির শেয়ালের
কাছে উপদেশ লইয়া আস। তাহার কাছে জানিয়া আস কি করিয়া
গেরস্তকে ফাকি দিয়া হাস মুরগি চুরি করিয়া আনা যায়!”
সেদিন
সন্ধ্যাবেলা ও-বাড়ির দরজায়
যাইয়া, “হুয়াহুয়া কি কর ভায়া?”
বলিয়া শেয়াল উপস্থিত হইল।
ও-বাড়ির শেয়াল লেজ উঁচু করিয়া ডাকিল, “কি হুয়া – কি
হুয়া! ভাই শেয়াল ?”
এ-বাড়ির শেয়াল বলিল, “দেখ ভাই! তুমি রােজ গেরস্তবাড়ি হইতে হাঁস মুরগি চুরি করিয়া আনিয়া খাও। আমি ত একদিনও | কিছু আনিতে পারি না। আমার গৃহিণী আমাকে তােমার কাছে পাঠাইয়া দিল। বল ত ভাই, কি করিয়া তুমি হাঁস মুরগি চুরি কর?” | হাঁস মুরগি চুরি করিবার কৌশল আছে। সে প্রথমে তার শেয়ালনিকে গেরস্তবাড়ির নিকটের জঙ্গলে যাইয়া ডাকিতে বলে । শেয়ালনির ডাকে গেরস্তবাড়ির কুকুর দৌড়াইয়া যায় তাকে তাড়া করিয়া। শেয়ালনি তখন গভীর জঙ্গলে যাইয়া পালায়। ইতিমধ্যে শেয়াল গেরস্তবাড়ির মােরগ মুরগির খােপ হইতে ইচ্ছামতো হাস, মুরগি, কবুতর চুরি করিয়া লইয়া আসে। এক বাড়িতে রােও চুরি করিতে গেলে গেরস্ত হুশিয়ার হইয়া উঠে। তাই আও? যদি সে এ গ্রামের ওই বাড়িতে হানা দেয়, কাল সে আর এক গ্রামের আর এক বাড়িতে যাইয়া মােরগ মুরগি ধরিয়া আনে। এইসব তার ব্যবসায়ী কৌশল। যাকে তাকে ত বলা যায় না! | সে তাই ফাকি দিয়া কহিল, “ভাই! আমি ত এমনিই মােরগ মুরগি ধরিয়া আনি । তুমিও যাও না ভাই!"।
এ-বাড়ির শেয়াল বলিল, “আরে ভাই! আমি ত কতবার গিয়াছি
চুরি করিতে, কিন্তু গেরস্তবাড়ির বাঘা কুকুরটা যখন তাড়িয়া আসে, তখন ত পালাইয়া প্রাণ
পাই না।” ও-বাড়ির শেয়াল বিজ্ঞের মতাে হাসিয়া বলিল, “তুমি তাও জান না? সমস্ত পশুজাতির রাজা হইল সিংহ! আমার কাছে সেই সিংহ রাজার অনুমতিপত্র আছে। হাঁস মুরগি ধরিতে গেলে কুকুর যখন তাড়িয়া আসে, তখন আমি সেই অনুমতিপত্র দেখাই । কুকুর অমনি
চুপ করিয়া থাকে। কুকুরও ত পশু! সে
কি পশুরাজের হুকুম অমান্য করিতে সাহস পায় ? | শেয়াল জিজ্ঞাসা করিল, “সিংহরাজের দেখা কোথায় পাইব?"
“আরে
তাও জান না? ওই পাহাড়টা দেখিতে
পাইতেছ না? তারই একটু ওধারে যে ঘন শালবন
আছে, সেইখানে সিংহ থাকে।” এই কথা শুনিয়া
মনের আনন্দে হুয়া হুয়া ডাকিতে ডাকিতে শেয়াল বাড়ি ফিরিল। সারারাত শেয়ালনির সঙ্গে এ বনে সে
বনে ঘুরিয়া কয়েকটি কাঁকড়া আর কিছু মধুর
চাক সংগ্রহ করিল। পশুরাজের সঙ্গে দেখা করিতে ত খালি হাতে
যাওয়া যায় না! শেয়ালনি গােপনে কিছু সজারুর কাঁটা জোগাড় করিয়া রাখিয়াছিল। দুর্দিনে ছেলেমেয়েদের খাইতে দিবে। তাও একটা ছাগলের চামড়ায় বাঁধিয়া দিল। তারপর সারারাত জাগিয়া দুইজনে নানারকম জল্পনা কল্পনা চলিল, কিভাবে সিংহের নিকট যাইয়া দাঁড়াইতে হইবে, কিভাবে তাহাকে সালাম করিতে হইবে।
সকাল
হইলে সবকিছু সঙ্গে লইয়া, একটি ব্যাঙের ছাতি মাথায় দিয়া শেয়াল পশুরাজ সিংহের বাড়ি রওয়ানা হইল। ঘন বেতের জঙ্গল
ছাড়িয়া বড় বড় জামগাছ, আমগাছ। সেইসব গাছের ডালে ডালে জড়াইয়া রহিয়াছে শ্যামালতা, আমগুরুজ লতা, আর জারমনি লতার
ঝাড়। সেসব ছাড়াইয়া শালের বন। শালফুলের গন্ধে বাতাস ভরিয়া উঠিয়াছে। গাছের ডালে ডালে মৌমাছির চাক হইতে টস্ টন্ করিয়া মধু ঝরিয়া পড়িতেছে। সেসব ছাড়াইয়া ঘন শ্বেতখড়ির বন।
সাদা সাদা ফুল ফুটিয়া সমস্ত বন আলাে করিয়া
রাখিয়াছে। যাইতে যাইতে শেয়াল দেখিতে পাইল, সামনেই সিংহরাজার বাড়ি। পাহাড়ের সামনে একটি গহ্বর। সামনে নানারকম জানােয়ারের হাড়গােড় কত যে পড়িয়া
রহিয়াছে কে তাহা নিরূপণ
করিবে।
সেইখানে
যাইয়া শেয়াল ডাকিয়া উঠিল, “হুয়া, হুয়া, হুয়া!” গহ্বরের ভিতর হইতে সিংহ গৰ্জন করিয়া উঠিল, “গোঁ গোঁ কে গো?”
শেয়াল
দশ হাত সালাম করিয়া জোড়হাতে উত্তর দিল, “মহারাজ! আমি আপনার গরিব প্রজা শেয়াল। আপনার নিকট কিঞ্চিৎ ভেট লইয়া আসিয়াছি।”
এই
বলিয়া শেয়াল ছাগলের চামড়ায় বাধা সেইসব দ্রব্যসামগ্রী আর মৌমাছির চাকখানা
সিংহের সামনে তুলিয়া ধরিল। মৌমাছির চাকখানা মুখে পুরিয়া সিংহ বড়ই খুশি হইল ।
সে
হাসিয়া বলিল, “তা কি মনে
করিয়া শেয়াল ?”
শেয়াল
জোড়হাত করিয়া বলিল, “মহারাজ! আমি রােজ রাত্রে গেরস্তবাড়িতে হাঁস মুরগি ধরিতে যাই ; কিন্তু গেরস্তবাড়ির কুকুরটা আমাকে দেখিলেই তাড়িয়া আসে। আপনি আমাকে একখানা অনুমতিপত্র দিন। তাহার মধ্যে এমন সব কথা লিখি।
দিবেন, যাহা পড়িয়া কুকুর যেন আমাকে দেখিয়া তাড়িয়া না আসিতে পারে।"
শেয়ালের
কথা শুনিয়া সিংহ খুব কৌতুক বােধ করিল। এমনভাবে ত কেহ তাহার
কাছে অনুমতিপত্র চাহিতে আসে না! কিন্তু কি করিয়া সিংহ
অনুমতিপত্র লেখে। সে ত সত্যই
লেখাপড়া জানে না। অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া সে তাহার লেজ
হইতে কয়েক গুচ্ছ লােম ছিড়িয়া দিল। আর: বলিল, “এই তােমার অনুমতিপত্র।
কুকুর যখন তােমার উপর; তাড়া করিয়া আসিবে, তখন এটা দেখাইলেই সে শান্ত হইয়া
যাইবে।"
সিংহরাজের
নিকট হইতে অনুমতিপত্র পাইয়া শে? খুশি হইয়া বাড়ি ফিরিল।
রাত্র
হইলে সে সেই অনুমতিপত্র
ঠোটে আটকাইয়া গেরস্তবাড়ির মুরগির ঘরে হানা দিল। তৎক্ষণাৎ গেরস্তবাড়ির বাঘা কুকুরটি ঘেউ ঘেউ শব্দ করিয়া তাড়িয়া আসিল।
শেয়াল
তখন নিরুপায় হইয়া বনের মধ্যে পলাইয়া গেল। সমস্ত কাহিনী শুনিয়া শেয়ালের বউ বলিল, “কুকুর
যখন তাড়িয়া আসিল, তখন তুমি সিংহের দেওয়া অনুমতিপত্রখানা দেখাইলে না কেন ?"
শেয়াল বলিল, “তুমি ত বলিলে অনুমতিপত্র
দেখাইলে না কেন ? কিন্তু
মারমুখাে হইয়া কুকুর যখন তাড়িয়া আসিল, তখন অনুমতিপত্র দেখায় কে ? কার বুকে কতখানি সাহস আছে যে কুকুরের সামনে
যাইয়া দাঁড়াইবে?"
সমাপ্ত
No comments:
Post a Comment