Monday, December 21, 2020

সেরাটা কত বড়


 

--জসিম উদ্দিন

তাঁতি আর তাঁতির বউ। সারাদিন তাঁত খট খট, চরকা ঘড় ঘড়। সকাল হইতে সন্ধ্যা এদের কাজের বিরাম নাই। কিন্তু এত কাজ করিয়াও পেট ভরিয়া খাইতে পায়। তঁতের কাপড় বিক্রি করিয়া অতি সামান্যই তাহারা আয়।

একদিন তাঁতির বউ তাঁতিকে ডাকিয়া বলিল, “দেখ, আমাদের বাড়ির কাছে চাষীরা কত সুখে আছে। তাদের ক্ষেতে ধান হয়, কাউন হয়, আরও কত রকমের ফসল হয়। এসব দিয়া গেরস্ত বউরা বারােমাসে তের রকমের পিঠা করে!

তুমি এক কাজ কর এই তাঁত-খুটি বেচিয়া বাজার হইতে বীজধান কিনিয়া আন। আমাদের বাড়ির কাছের ওই জমিটায় আমরা ধান বুনিয়া দিব।

তাতি বলিল, “বউ। তুই খুব ভাল পরামর্শ দিয়াছিস! আমাদের ক্ষেতে যখন ধান হইবে, তখন কি মজাই না হইবে! নতুন ধান ভানিয়া তুই কি কি পিঠা বানাইবি ?" | তাঁতির বউ বলে, “চিতই পিঠা, পাঠিসাপটা পিঠা, বড়া পিঠা।" শুনিয়া তাঁতির জিহ্বায় পানি আসে আর কি ! বল খােকাখুকুরা, তাঁতির বউ আর কি কি পিঠা বানাইবে? যে আগে বলিতে পারিবে তারই জিত। | মহাউৎসাহে তাঁতি তার তাঁত-খুটি মাথায় করিয়া হাটে চলিল। অনেক দরদস্তুর করিয়া সে পাঁচসিকাতে সেই তাঁতখুটি বিক্রি করিল। তারপর যাকে দেখে তাকেই জিজ্ঞাসা করে, “তােমার কাছে বীজধান আছে ?" বেনেতি দোকানে, ওষুধের দোকানে যাইয়া সে জিজ্ঞাসা করে, “পাঁচসিকার বীজধান দিতে পার ভাই ?

সবাই ঠাট্টা করিয়া তাঁতিকে তাড়াইয়া দেয়। বীজধান আর যেখানে সেখানে যার তার কাছে পাওয়া যায় না।

আগেকার দিনে হাটে বাজারে দু'একজন ট্যাটন থাকিত। লােক ঠকাইয়া তাহারা টাকা-পয়সা উপার্জন করিত। তাতি এমনই এক ট্যাটনের কাছে বীজধানের খোঁজ করিতেই সে তাঁতিকে খুব আদর করিয়া হাটের বাহিরে একটি চষা ক্ষেতের কাছে লইয়া গেল। | চাষীরা চষা ক্ষেত হইতে ঘাসের শিকড়-বাকড় কুড়াইয়া এক জায়গায় জড়াে করিয়াছিল। উদ্দেশ্য ছিল, এগুলি রৌদ্রে শুকাইয়া আগুন দিয়া পুড়াইয়া ফেলিবে। তাহাতে সেই শিকড়-বাকড়গুলি হইতে ঘাসের চারা গজাইবে না।

সেই চালাক ট্যাটন বােকা তাঁতির নিকট হইতে পাঁচসিকা দাম লইয়া একবস্তা ঘাসের শিকড়-বাকড় বিক্রি করিল আর বলিয়া দিল, “তােমার জমিটা খুব ভাল করিয়া চষিয়া এগুলি বুনিয়া দিও। খুব ভাল ফসল হইবে।” | মনের আনন্দে নাচিতে নাচিতে তাঁতি সেই শিকড়-বাকড়ের বস্তা মাথায় করিয়া বাড়ি ফিরিল।

পরদিন সকাল না হইতেই তাঁতি আর তার বউ কোদাল লইয়া তাহাদের বাড়ির সামনের জায়গাটি কোপাইতে লাগিল। তাহাদের গরু নাই যে জমি চষিয়া লইবে।

তাঁতি আর তার বউ। তারা তাঁত চালাইতে জানে, চরকা ঘুরাইতে পারে, কিন্তু জমি কোপাইতে তাহারা বড়ই হয়রান হইয়া পড়িল। অপটু হাতে কোদাল চলে না। তঁাতি মাটিতে এক কোপ মারিয়া হাঁপাইয়া পড়ে, তাঁতির বউ কোদাল লইয়া মাটিতে আর এক কোপ দিয়া শুইয়া পড়ে। তাঁতি গামছা দিয়া বাতাস করিয়া তাকে সুস্থ করে। আবার তাঁতি কোদাল লইয়া মাটিতে দুই তিন কোপ দিয়া হয়রান হইয়া পড়ে, তাঁতির বউ তার কপালে তেল মালিশ করে, হাত পা টিপিয়া দেয়।

এইভাবে প্রায় একমাস পরিশ্রম করিয়া বাড়ির সামনের জমিটুকু তারা কোপাইয়া শেষ করিল শুধু কি কোপাইল ? জমিতে ঘাসের শিকড়-বাকড় যা কিছু ছিল সব বাছিয়া ক্ষেতের এক পাশে জড়াে করিল। | শুভদিনে শুভক্ষণে তারা হাট হইতে কেনা সেই ঘাসের শিকড়-বাকড় ক্ষেতের মধ্যে ছড়াইয়া দিল। তারপর তাঁতি আর তার বউ প্রতিদিন সকালে বিকালে সেই জমিতে কলসি কলসি পানি আনিয়া ঢালিতে লাগিল।

একে ঘাসের শিকড়-বাকড়, তার উপর এত যত্ন! কয়েক দিনের ভিতরে কালাে মেঘের মতাে করিয়া তাঁতির ক্ষেতখানি নতুন নতুন ঘাসের চারায় ভরিয়া গেল। দেখিয়া তাদের কি আনন্দ ! তাহারা আরও যত্ন করিয়া ক্ষেতে পানি ঢালিতে লাগিল।

অল্পদিনের মধ্যেই সেই ক্ষেতের ঘাস বুক সমান উঁচু হইয়া উঠিল। তাঁতি আর তার বউ মনের খুশিতে সেই ক্ষেতের চার পাশ ঘুরিয়া নাচে আর গান করে। ভাের হইতেই তাঁতি ছুটিয়া আসে তার ক্ষেত দেখিতে। সেদিন অসিয়া দেখে কি, কার যেন গরু আসিয়া ক্ষেতের ধান খাইয়া গিয়াছে। সারাদিন অনেক জল্পনা-কল্পনা করিয়া তাতি রাত্র জাগিয়া ক্ষেত পাহারা দিতে লাগিল। | রাত যখন ভাের হয়-হয়, এমন সময় তাঁতি দেখে কি, কার যেন একটা গরু আসিয়া তার ক্ষেতের ধান খাইতেছে। তাঁতি তাড়াতাড়ি যাইয়া গরুটির লেজ ধরিয়া ফেলিল। গরুটি তৎক্ষণাৎ আকাশে উড়িতে আরম্ভ করিল। উড়িতে উড়িতে মুনিঠাকুরের আথালে যাইয়া পৌছিল। তাঁতি গরুর লেজ ধরিয়াই আছে।

সেই গরুটি ছিল আকাশের মুনিঠাকুরের। সকালবেলা দোহাইতে আসিয়া মুনিঠাকুর দেখেন, তাঁর গরুর লেজ ধরিয়া একটি মানুষ। মুনিঠাকুরকে দেখিয়া, তাঁতি তেড়িয়া-বেড়িয়া বলিল, “আপনার কি আক্কেল ? আমি গরিব মানুষ! আপনার গরু ছাড়িয়া দিয়া আমার ক্ষেতের ধান খাওয়ান।

তাঁতির প্রতি মুনিঠাকুরের দয়া হইল। মুনিঠাকুর তাঁতিকে দুই সের চাউল দিয়া বলিলেন, “এই চাউল লইয়া গিয়া একটি হাঁড়ির মধ্যে রাখিবে। সেই হাঁড়ি হইতে যত চাউল লইবে হাঁড়ির চাউল ফুরাইবে না! কিন্তু সাবধান! হাঁড়ির চাউল যদি কাউকে ধার দিবে, তবে কিন্তু চাউল আর বাড়িবে না। আমার গরুকে তােমার ক্ষেতে যাইতে দিও। তাকে ঘাস খাইতে বাধা দিও না।” | সন্ধ্যা হইলে মুনিঠাকুরের দেওয়া সেই চাউল গামছায় বাধিয়া গরুর লেজ ধরিয়া তাঁতি বাড়ি ফিরিয়া আসিল। তাঁতির বউ খুঁটিয়া খুঁটিয়া তাতির নিকট হইতে সমস্ত খবর শুনিল। তারপর প্রতিদিন সেই হাঁড়ি হইতে চাউল লইয়া তাঁতি আর তাতির বউ ভাত রাঁধিয়া পেট ভরিয়া খায়। মনের আনন্দে তাঁতির বউ পিঠা তৈরি করে। আজ পিঠা, কাল সে পিঠা ; অল্পদিনের মধ্যে তাহাদের নাদুসনুদুস চেহারা হইয়া উঠিল।

বাড়ির কাছে এক গেরস্তের বউ। সে বলে, “দেখরে, তাঁতির বউ রােজ আসিত আমার কাছে এটা ওটা ধার করিতে, ভাতের ফেন লইয়া যাইতে; কিন্তু আজ একমাসের মধ্যে তাঁতির বউ। আমাদের বাড়িতে আসে না। ওদের চেহারাও বেশ। মােটাসােটা হইয়া উঠিয়াছে। না-খাওয়া মানুষের মতাে লাগে। ইহার কারণ কি?" গেরস্ত-বউ তাঁতির বাড়িতে আসিল। তাঁতি যদিও বউকে বারণ করিয়া দিয়াছিল, মুনিঠাকুরের ব্যাপারটা কাউকে না বলিতে কিন্তু তাঁতির বউ এত বড় ঘটনাটা কি করিয়া পেটে হজম করিতে পারে! আজ গেরস্ত-বউকে কাছে পাইয়া একথা ওকথার পরে সে মুনিঠাকুরের ব্যাপারটা সব খুলিয়া বলিল। অনেকক্ষণ গালগল্প করিয়া তাতির বউ গেরস্তের বউকে বলিল, “একটা কথা, আমাদের কাছে কোনােদিন চাউল ধার নিতে আসিবে না ; যদি কাউকে চাউল ধার দেই, তবে আর হাঁড়ির চাউল বাড়িবে না।

পরের ভাল কে দেখিতে পারে? তাঁতিদের এই উন্নতি দেখিয়া গেরস্তের বউ হিংসায় জ্বলিয়া পুড়িয়া মরে। সে পরদিন আসিয়া বলিল, “বলি বুবু! আমাকে এক সের চাউল ধার দাও।তাঁতি-বউ বলিল, “না, তা দিতে পারিব না। তােমাকে ধার দিলে হাঁড়ির চাউল আর বাড়িবে না।গেরস্তের বউ বলিল, “বুবু, তােমার মাথার কিরা, আমাকে এক সের চাউল ধার দাও। চাউল ধার দিলে হাঁড়ির চাউল যে। বাড়ে না, একটা কথার কথা! হাঁড়ির চাউল নিশ্চয় বাড়িবে। চাউল ধার দিলে হাঁড়ির চাউল বাড়ে কি না একবার পরীক্ষা করিয়াই দেখ না ?" তাঁতি-বউর মন গলাইতে বেশিক্ষণ লাগিল না। গেরস্তের বউ ৩াহার নিকট হইতে এক সের চাউল কর্জ করিয়া বাড়ি ফিরিল।।

সন্ধ্যাবেলা তাঁতির বউ রান্না করিতে চাউলের হাঁড়িতে হাত দিয়াছে হাঁড়িতে একটিও চাউল নাই। হাঁড়িটি লইয়া এদিকে ঘুরায়, ওদিকে ফিরায়, কিন্তু চাউল বাহির হয় না। তখন মাথায় বাড়ি! তাঁতি আসিয়া সকল কথা শুনিয়া বউকে খুব বকিল কিন্তু বকিয়া আর কি হইবে! পরামর্শ করিয়া স্থির করিল, তাহারা দুইজনেই গরুর লেজ ধরিয়া আবার সেই মুনিঠাকুরের বাড়ি যাইবে। রাত হইলে মুনিঠাকুরের গরু আসিয়া যেই তাঁতির ক্ষেতে ঘাস খাইতে আরম্ভ করিয়াছে, তাঁতি দৌড়াইয়া যাইয়া গরুর লেজ ধরিয়া ফেলিল। গরু তু তাড়া খাইয়া আকাশে উড়িতে আরম্ভ করিল। তাঁতির বউ আসিয়া তাতির পা ধরিয়া ফেলিল। গেরস্তের বউ গােপনে ক্ষেতের একপাশে লুকাইয়া ছিল। মুনিঠাকুরের বাড়ি যাইবার জন্য তাহারও বড় ইচ্ছা। সেও যাইয়া তাতি-বউর পা ধরিয়া ঝুলিয়া রহিল। ধীরে ধীরে অনেক উপরের আকাশ দিয়া তাহারা উড়িয়া যাইতে লাগিল।

এত দুরের পথ চলিতে তাঁতি-বউ চুপ করিয়া থাকিতে পারে সে তাঁতিকে জিজ্ঞাসা করে, “আচ্ছা বল , মুনিঠাকুর যে সের দিয়া তােমাকে চাউল মাপিয়া দিয়াছিলেন সে সেরটা কত বড়?" তাঁতি বউর উপর আগেই চটা! সে ধমক দিয়া বলিয়া উঠিল, “তা দিয়া তােমার কি হইবে?” তাঁতীর বউ কাঁদিয়া কাটিয়া মান অভিমান করিয়া বলিল, “আচ্ছা বল না কত বড় সেরটা।এবার তাঁতি রাগিয়া মাগিয়া গরুর লেজ হইতে হাত ছাড়িয়া যেই দেখাইতে গিয়াছেএই এত্ত বড় সেরটা।

অমনি তাঁতি পড়িল তাঁতি-বউর উপর, তাঁতি-বউ পড়িল গেরস্তের বউর উপর। তিনজন ধগ্লাস করিয়া মাটিতে পড়িয়া গেল।

 

 সমাপ্ত

 

 

 

No comments:

Post a Comment

পাথর

  ---হুমায়ুন আহমদ পাথর “ চিত্রা মা , চা - টা উপরে দিয়ে আয়তাে। ' চিত্রা বারান্দায় বসে নখ কাটছিল। বাঁ হাতের কড়ে আঙ্গুলের...