Monday, December 21, 2020

তুমভি কাঁঠাল খায়া

 




--- জসিম উদ্দিন

এক কাবুলিওয়ালা বাঙলাদেশে নৃতন আসিয়াছে! বাজারে যাইয়া দেখে বড় বড় কাঠাল বিক্রি হইতেছে। পাকা কাঠালের কেমন সুবাস ! নাজানি খাইতে কত মিষ্টি! তাহার দেশে এত বড় ফল পাওয়া যায় না। মাত্র আট আনা দিয়া মস্ত বড় একটা কাঁঠাল সে কিনিয়া ফেলিল। কাঠালটি লইয়া সে একবার ঘ্রাণ শুকিয়া দেখে, আবার কাঁধে লইয়া দেখে তারপর খুশিতে নাচিতে নাচিতে কাঠালটি বাসায় লইয়া গেল।

আমরা জানি, কাঠাল খাইতে হইলে হাতে তেল মাখাইয়া লইতে হয়, ঠোটে তেল লাগাইয়া লইতে হয় তাহা না করিলে কাঁঠালের আঠা হাতে মুখে লাগিয়া যায়। সাবান পানি দিয়া কিছুতেই তােলা যায় না

কাবুলিওয়ালা নূতন লােক। এসব কিছুই জানে না। সে দুই হাতে কাঠালটি ধরিয়া কামড়াইতে লাগিল। কাঁঠালের আঠা তাহার হাতে লাগিল, মুখে লাগিল, দাড়িতে লাগিয়াই দাড়ি জট পাকাইয়া গেল ; কিন্তু সেদিকে কে খেয়াল করে! এমন মিষ্টি কাঠাল আর এমন তার খােশবু! সে ছােবড়াসমেত সমস্ত কাঠালটি খাইয়া ফেলিল। তারপর হাতমুখ ধুইতে যাইয়া বড়ই বিপদে পড়িল সাবান ঘষিয়া, সােডার পানি গােলাইয়া সে হাত আর দাড়ি যতই পরিষ্কার করিতে যায়, ততই হাতে-মুখে, দাড়িতে কাঁঠালের আঠা আরও চটচট করে।

রাত্রে শুইতে যাইয়া আরও মুশকিল। এপাশ হইতে ওপাশ ফিরিতে বিছানা বালিশে দাড়ি আটকাইয়া চটচট করিয়া তাহাতে কিছু দাড়ি ছেড়া যায়। দাড়িতে হাত বুলাইতে হাত দাড়ির সঙ্গে আটকাইয়া যায় তাহাতে কিছু দাড়ি ছেড়া যায় ! সারারাত সে ঘুমাইতে পারিল না।

পরদিন হাটের বার। এটা ওটা কিনিতে সে হাটে গিয়াছে তরকারির দোকানে তরকারি দর করিতে, ঝিঙ্গা-পটল দাড়ির সঙ্গে আটকাইয়া আসে, মাছের দোকানে মাছ তার দাড়িতে আটকাইয়া আসে। দোকানিরা দাড়ি হইতে সেগুলি ছাড়াইয়া লইতে দাড়ি চটচট করিয়া ছেড়ে। বেচারি কি আর করে ! মনের দুঃখে কিছু না কিনিয়াই বাসায় ফিরিয়া আসিতে চায়।

তাও কি ফিরিয়া আসিতে পারে ? দাড়ির সঙ্গে ওর ছাতা আটকাইয়া যায় তার গামছা আটকাইয়া যায়। সকলে তাহাকে ধরিয়া মারিতে আসে।

মনের দুঃখে বেচারা এক যুবকের কাছে যাইয়া জিজ্ঞাসা করে, “হা বাবুজি! হামি কাঁঠাল খাইছে। কাঁঠালের আঠা হামার দাড়িমে আর গোফমে লাগ গিয়া। কিছিছে ছেড়তা নেহি। আব ক্যা করেংগা সাব ?"

যুবকটি দেখিল বেশ মজা হইয়াছে! সে আরও মজা দেখিবার জন্য বলিল, “আপনি দাড়িতে কিছু ছাই লইয়া মাখান, আঠা ছাড়িয়া যাইবে।

কাবুলিওয়ালা বাসায় যাইয়া তাহাই করিল। ছাই মাখানের ফলে তাহার দাড়িতে কাঁঠালের আঠা আরও জট পাকাইয়া গেল। মুখের চেহারা বদ হইয়া পড়িল। কাবুলিওয়ালা কি আর করেখাইতে গেলে হাত দাড়িতে লাগিয়া আটকাইয়া যায়, শুইতে গেলে বিছানা-বালিশের সঙ্গে দাড়ি জড়াইয়া যায়। এপাশ ওপাশ হইতে দাড়ি চট চট করিয়া ছেড়ে। অবশেষে সে একজন বৃদ্ধ লােকের কাছে যাইয়া সকল কথা খুলিয়া বলিল।য়্যা বাবুজি। হামি কাঁঠাল খাইছে। আওর কাঁঠাল কা আঠা হামার দাড়িমে গোঁফমে লাগ গিয়া! এক যােয়ান কা পরামর্শমে উছকা পর হাম ছাই লাগায়ে দিয়া এসিসে দাড়িমে জট পাকায়া, আভি হাম ক্যা করেংগা ?”

সমস্ত শুনিয়া বৃদ্ধ লােকটি বলিলেন, “সাহেব! একে কাঁঠালের আঠা তােমার দাড়িতে লাগিয়াছে, তার উপরে মাখাইয়াছ ঘুটের ছাই। এর উপরে আর কোনাে কেরামতিই খাটিবে না। তুমি এক কাজ কর, নাপিতের কাছে যাইয়া গোঁফদাড়ি কামাইয়া ফেল।"

কতকাল ধরিয়া কাবুলিওয়ালা তাহার মুখের এই দাড়ি জন্মাইয়াছে। গাড়িতে ইষ্টিমারে এই দাড়ি দেখিয়া লােকে তাহাকে কত খাতির করে। নিমন্ত্রণ বাড়িতে এই দাড়ি দেখিয়া লােকে তাহার পাতে আরও দুইটা বেশি করিয়া রসগােল্লা-সন্দেশ আনিয়া দেয় আজ সেই দাড়ি কাটিয়া ফেলিতে হইবে। মনের দুঃখে কাবুলিওয়ালা অনেকক্ষণ কাঁদিল কিন্তু কাঁদিয়া কি হইবে ? নিরুপায় হইয়া সে এক নাপিতের কাছে যাইয়া দাড়ি-গোঁফ কামাইয়া ফেলিল।

তার দুঃখের ভাগী আর কে হইবে। হাটে-পথে, মাঠে-ঘাটে সে যখন যাহাকে দাড়ি কামানাে দেখে, তারই গলা জড়াইয়া

ধরিয়া বলে, “ভায়া হে! তুমভি কাঁঠাল খায়া ?”

সে মনে করে, যাহাদের দাড়ি নাই, তাহারও বুঝি কাঁঠাল খাইতে কাঁঠালের আঠা দাড়িতে লাগাইয়া তাহারই মতো দাড়ি কামাইয়া ফেলিয়াছে।

 

 

 

No comments:

Post a Comment

পাথর

  ---হুমায়ুন আহমদ পাথর “ চিত্রা মা , চা - টা উপরে দিয়ে আয়তাে। ' চিত্রা বারান্দায় বসে নখ কাটছিল। বাঁ হাতের কড়ে আঙ্গুলের...