Monday, December 21, 2020

ভাগাভাগি

 

---জসিম উদ্দিন

বাপ মরিয়া গিয়াছে দুই ভাই পৃথক হইবে বড় ভাই ছােটভাইকে বলিল, “দেখ, আমাদের একটিমাত্র গাই আছে, কাটিয়া আর দুই ভাগ করা যাইবে না। তুই ছােটভাই। তােকেই গাই' বড় ভাগটা দেই। তুই গাই মুখের দিকটা নে। আর আমি গাই লেজের দিকটা লই।

ছােটভাই ভারি খুশি! বড়ভাই যে তাহাকে ভাল ভাগটা দিয়াছে, সেজন্য সে বড়ভাইয়ের প্রতি খুবই কৃতজ্ঞ। সে সারাদিন এখান হইতে ওখান হইতে ঘাস কাটিয়া আনিয়া গাইকে খাওয়ায়। বড়ভাই রােজ সকালে হাঁড়ি ভরিয়া দুধ দোয়ায়।

সেই দুধ দিয়া ছানা বানায়, ছানা দিয়া রসগােল্লা বানায়, সন্দেশ বানায় আরও কত কি বানায়! বল খােকাখুকুরা আর কি কি বানায়? যে আগে বলিবে তারই জিত। বড়ভাই ভারি খুশি, “বেশ আমার ছােটভাই। এমনিই চাই। এবার বুঝিতে পারিলাম, বাপের সম্পত্তি তুমি ঠিকই রক্ষা করিতে পারিবে তােমার ভাগে যখন গাইর মুখের দিকটা পড়িয়াছে, তখন নিশ্চয়ই তােমাকে ভালমতাে তাকে খাওয়াইতে।

বড়ভাইর তারিফ শুনিয়া ছােটভাই আরও বেশি করিয়া গরুকে ঘাস দেয়। বড়ভাই আরও বেশি করিয়া গরুর দুধ দোয়ায়; আর ছােটভাইকে আরও বেশি করিয়া তারিফ করে।

একজন চালাক লােক একদিন ছােটভাইকে বলিল, “আরে বােকা! তুই গরুর মুখের দিকটা লইয়া, দিনরাত গরুকে ঘাস খাওয়াইয়া মরিতেছিস, আর ওদিকে তাের বড়ভাই মজা করিয়া দুধ দোয়াইয়া লইতেছে।"

ছােটভাইর তখন টনক নড়িল, “তাই ! কিন্তু এখন কিছুই করার উপায় নাই। আমি যে আগেই গরুর মাথার দিকটা রইয়া ফেলিয়াছি। ঘাস আমাকে খাওয়াইতেই হইবে।"

চালাক লােকটি তখন ছােটভাইকে কানে কানে একটি বুদ্ধি দিয়া গেল।

পরদিন সকাল। যেই বড় ভাই গাইর দুধ দোয়া ইত আসিয়াছে, অমনি ছােটভাই গাইর মাথায় একটি মুগুর লইয়া বাড়ি মারিতে আরম্ভ করিল। মুগুরের ঘায়ে গাই এদিক ওদিক নড়ে। গাই দোয়ানাে অসম্ভব। বড়ভাই তখন বলে, “আরে করিস কি? করিস কি ?”

ছােটভাই উত্তর দেয়, “রােজ আমি গরুকে ঘাস খাওয়াই। দুধ দুইয়া লইয়া যাও তুমি। আমাকে একফোটা দুধও দাও না। গরুর মাথার দিকটা যখন আমার, তার উপরে আমি মুগুরই মারি, আর কুড়ালই মারি, তুমি কোনাে কথা বলিতে পারিবে।

বড়ভাই বুঝিল, কোনাে চালাক লােক ছােটভাইকে বুদ্ধি দিয়াছে। সে তখন ছােটভাইকে বলিলআর তুই গাইর মাখায় মুগুর মারিস না। এখন হইতে গরুর দুধের অর্ধেক তােকে দিব।" ছােটভাই বলিল, “শুধু অর্ধেক দুধ দিলেই চলিবে না, তােমাকে আজ হইতে গরুর জন্য অর্ধেক ঘাসও কাটিতে হইবে। নইলে এই মারিলাম আমি গরুর মাথায় মুগুরের ঘা!"

আরে রাখ রাখ।" বড়ভাই মুলাম হইয়া বলে, “আজ হইতে অর্ধেক ঘাসও আমি কাটিব!" বাড়িতে ছিল একটা খেজুর গাছ। শীতকাল, খেজুর গাছ কাটিয়া রস বাহির করিতে হইবে। বড়ভাই ছােটভাইকে বলে, "আমাদের একটামাত্র খেজুর গাছ। কাটিয়া ভাগ করা যায়। সেরার গরুর মাথার দিকটা লইয়া তুই ঠকিয়াছিলি। এবার বল্ খেজুর গাছের কোন দিকটা নিবি? গােড়ার দিকটাই বুঝি তাের পছন্দ হইবে।ছােটভাই কিছু না ভাবিয়াই উত্তর করে, “আমি খেজুর গাছের গােড়ার দিকটাই লইব।বড়ভাই খুশি হইয়া বলে, “আচ্ছা তাের কথাই থাক তুই ছােটভাই, ভাল ভাগটা চাহিলি, আমি বড়ভাই হইয়া না করিতে পারি না!”

ছােটভাই লইল খেজুর গাছের গােড়ার দিকটা। সে গাছের গােড়ায় রােজ পানি ঢালে। তাহাতে গাছ আরও তাজা হয়

বড়ভাই গাছের আগায় হাঁড়ি বসাইয়া মনের আনন্দে রস পাড়িয়া আনে। শীতকালে খেজুরের রস খাইতে কি মজা! রস দিয়া গুড় তৈরি হয় গুড় দিয়া চিনি তৈরি হয়, চিনি দিয়া কি কি তৈরি হয় খােকাখুকুরা? বল বল, যে আগে বলিতে পারিবে তারই জিত।

এইভাবে কিছুদিন যায়। বড়ভাই খেজুরের রস খাইয়া মােটা হইয়া উঠিয়াছে। আর ছােটভাই খেজুর গাছের গােড়ায় পানি ঢালিতে ঢালিতে মাজায় ব্যথা করিয়া ফেলিয়াছে।

এমন সময় সেই চালাক লােকটি আবার আসিয়া দেখিল ছােটভাই কেমন ঠকিয়াছে। সে তখন ছােটভাইকে সমস্ত বুঝাইয়া বলিল। ছােটভাই বলিল, “তাই , এবারও আমি ঠকিয়াছি। কিন্তু খেজুর গাছের গােড়ার দিকের ভাগ আমি নিজেই চাহিয়া লইয়াছি। এর আর কোনাে প্রতিকার হইবে না।

দূর বােকা কোথাকার! বুদ্ধি থাকিলে প্রতিকার হইবে না কেন ?" এই বলিয়া চালাক লােকটি ছােটভাইর কানে কানে আর একটি বুদ্ধি দিয়া গেল। বল খােকাখুকুরা, কি বুদ্ধি দিয়া গেল?

পরদিন সন্ধ্যাবেলা, যেই বড়ভাই খেজুর গাছে উঠিয়া সেখানে হাঁড়ি পাতিতে গাছের খানিকটা কাটিতেছে, অমনি ছােটভাই একখানা কুড়াল লইয়া খেজুর গাছের গােড়া কাটিতে লাগিল, খপূ-খপূ-খ।

বড়ভাই গাছের উপর হইতে শব্দ শুনিয়া বলিল, “আরে করিস কি ? করিস কি ?”  ছােটভাই গাছের গােড়ায় কুড়াল মারিতে মারিতে উত্তর করিল, “তুমি গাছের মাথা লইয়াছ। রােজ গাছের মাথা হইতে রস পাড়ি খাও। আমাকে একটু দাও না। আমার যখন গাছের গােড়াটা, সেখানে আমি কুড়াল মারি আর যাই করি তুমি কিছু বলিতে পার না।এই বলিয়া ছােটভাই আবার গাছের গােড়ায় কুড়ালের কোপ দিতে আরম্ভ করিল, খপ-খপূ-খপু।আরে থা-থাম্‌-থা", বড়ভাই বলে, “আজ হইতে খেজুরের রসও অর্ধেক তােকে দিব।

দুই ভাই বেশ আছে, গরুর দুধ আর খেজুরের রস দুইজনে সমান সমান ভাগ করিয়া লয় তাহাদের বাড়িতে ছিল একখানা মাত্র কথা! বড়ভাই ছােটভাইকে বলে, “দেখ কথাখানাকে ছিড়িয়া দুই টুকরা করা যায় না। তুই কথাখানি দিনের ভাগে তাের কাছে রাখ। আমাকে রাত্র হইলে দিস।ছােটভাই খুব খুশি। বড়ভাই দিনের বেলার জন্য কাঁথাখানা তাহাকে দিয়াছে! কিন্তু দিনের বেলা গরম। তখন কাঁথা গায়ে দেওয়া যায় না। সে কথাখানাকে সারাদিন ভাজ করিয়া ভাজ করিয়া দেখে। রাত্র হইলে বড়ভাই কথাখানা লইয়া যায়। ছােটভাই সারারাত্র শীতে ঠিরঠির করিয়া কাপে। বড়ভাই দিব্যি আরামে কাঁথা গায়ে দিয়া ঘুমায় ।।

সেই চালাক লােকটি আবার আসিয়া ছােটভাইর অবস্থা দেখিল। দেখিয়া তার কানে কানে আর একটি বুদ্ধি দিয়া গেল।

পরদিন সন্ধ্যাবেলা ছােটভাই কথাখানা পানির মধ্যে ভিজাইয়া রাখিল। বড়ভাই যখন শুইবার সময় ছােটভাইর কাছে। কথা চাহিল, সে তাহাকে ভিজা কথাখানা আনিয়া দিল। বড়ভাই খুব রাগ করিয়া বলিল, “আরে করিয়াছিস কি ? কথাখানা ভিজাইয়া রাখিয়াছিস ?” ছােটভাই উত্তর করিল, কথাখানা যখন দিনের ভাগে আমার, তখন সেটা দিয়া আমি দিনের ভাগে যাহা ইচ্ছা করিতে পারি! তােমার ইহাতে কোনাে কথা বলিবার নাই।বড়ভাই তখন বলিল, “কাল হইতে আমরা দুই ভাই- একত্র কাঁথার তলে শুইব।


সমাপ্ত

 

 

 

 

 

No comments:

Post a Comment

পাথর

  ---হুমায়ুন আহমদ পাথর “ চিত্রা মা , চা - টা উপরে দিয়ে আয়তাে। ' চিত্রা বারান্দায় বসে নখ কাটছিল। বাঁ হাতের কড়ে আঙ্গুলের...