Saturday, December 19, 2020

কে বড়

 


-জসিম উদ্দিন

বা-- মণ-পালোয়ান। ইয়া বড় হাত, ইয়া বড় পা। বুকে থাপ্পড় মারে, যেন পাহাড়ের গায়ে পাহাড় আসিয়া পড়ে। সেই বাইশ-মণ-পালোয়ানের ভারি নাম-ডাক। একবার দেশে একটা বুনো হাতি আসিয়া উৎপাত আরম্ভ করিল। অমনি খবর গেল বাইশ-মণ-পালোয়ানের কাছে। বাইশ-মণ-পালোয়ান তার লেজ ধরিয়া এমনি চরকি-ঘুরুন ঘুরাইয়া ছাড়িয়া দিল যে, দশ মাইল দূরে সেই সুন্দরবনে যাইয়া হাতিটা ছিটকাইয়া পড়িল। সেদিন বাইশ-মণ-পালোয়ান চলিয়াছিল পথ দিয়া। একটি বিদেশী লোক তাহাকে বলিল, “কিহে বাইশ-মণ-পালোয়ান! ভারি অহঙ্কারে পথে হাঁটিতে দুনিয়াখানা কাঁপাইয়া চল। আমাদের দেশের তেইশ-মণ-পালোয়ানের নাম শুনিয়াছ? তার সঙ্গে লড়াই করিয়া যদি জিতিয়া আসিতে পার তবেই বুঝিব যে, তুমি একটা পালোয়ান বটে।" | শুনিয়া বাইশ-মণ-পালোয়ান রাগে আর বাঁচে না। তখনই তার কাছে ঠিক-ঠিকানা জানিয়া লইয়া সে চলিল তেইশ-মণ পালোয়ানের দেশে। যাইতে যাইতে যাইতে, সকাল গড়াইয়া দুপুর হইল। যাইতে যাইতে যাইতে, দুপুর গড়াইয়া বিকাল হইয়া আসিল। তখন সামনে দেখে এক প্রকাণ্ড দিঘি। এত পথ হাঁটিয়া বাইশ-মণ-পালোয়ানের বড়ই পিপাসা লাগিয়াছে। অমনি দিঘির মাঝখানে যাইয়া সে দাঁড়াইল দিঘিতে এত যে অথই পানি, হায়! হায় !! বাইশ-মণ পালোয়ানের সেখানে মাত্র হাঁটু পর্যন্ত ডুবিল। পদ্মা নদীর মতো পানি যদি গভীর হইত, তবে কোমর পর্যন্ত ডুবাইয়া অনায়াসে দুই হাত ভরিয়া সে পানি খাইতে পারিত। বেচারা আর কি করিবে! সেই পুকুরের মধ্যে শুইয়া পড়িয়া সে দুই হাতে দুই ধারের পানি ঠেলিয়া আনিয়া মুখে পুরিতে লাগিল, --ঘন্ঘঘ---ঘ। খাইতে খাইতে দিঘির প্রায় সব পানি শেষ হইয়া আসিল, তখন কেবলমাত্র কাদা-মেশানো পানি বাকি আছে যা পান করিলে পেটে অসুখ হইবে। কোনোরকমে পানি খাওয়াটা শেষ করিয়া বাইশ-মণ-পালোয়ান আবার পথ চলিতে আরম্ভ করিল।

যাইতে যাইতে যাইতে রাত গড়াইয়া সকাল হইল। সকালবেলার বাতাসে বাইশ-মণ-পালোয়ানের কিছু আনন্দ হইল। দেখে, সামনে একটি প্রকাণ্ড বটগাছ। বটগাছটি বাম হাতের টানে উপড়াইয়া, তার গোড়া দিয়া সে দাঁতন করিতে করিতে পথ চলিতে লাগিল। এইভাবে যাইতে যাইতে, তেইশ-মণ পালোয়ানের দরজায় আসিয়া সে হাজির হইল দরজা ভিতর হইতে বন্ধ মুখে সেই শিকড়-বাকড়সহ বটগাছের দাঁতন। বাইশ-মণ-পালোয়ান দরজায় ধাক্কা মারে আর ডাকে— “ তেইশ-মণ-পালোয়ান! তেইশ-মণ-পালোয়ান!" ধাক্কার চোটে ঘরবাড়ি সব থরথর করিয়া কাঁপিতে লাগিল। তেইশ-মন-পালোয়ান বাড়ি নাই, বাড়ি আছে তার ছোট মেয়েটি। দরজা খুলিয়া একটু আগাইয়া আসিয়া সে মিহি গলায় একটু বিরক্তির স্বরে জিজ্ঞাসা করিল,

দরজার উপর অত চেঁচামেচি করে কে ?”

এতবড় একজন পালোয়ান দরজায়, সেজন্য মেয়েটির মনে একটুও বিস্ময় নাই! বাইশ-মণ-পালোয়ানের গা জ্বালা করিতে লাগিল সে জিজ্ঞাসা করিল, “বলি তেইশ-মণ-পালোয়ান বাড়ি আছে?”

তাকে দিয়া তোমার কাজ কি ?"

আমি বাইশ-মণ-পালোয়ান। তার সঙ্গে লড়াই করিতে আসিয়াছি। তেইশ-মণ-পালোয়ানের তুমি কি হও বটে হে?" | “আমি তার মেয়ে। মেয়েটি অতি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে জিজ্ঞাসা করিল, “বলি তোমার হাতে ওটা কি ?”

বাইশ-মণ-পালোয়ান বুক ফুলাইয়া খুব গর্বের সঙ্গে উত্তর করিল, “পথ দিয়া আসিতেছিলাম, দেখিলাম একটা বটগাছ। তা বাঁ হাতের টানে ওটাকে উপড়াইয়া দান করিতে করিতে আসিলাম।" | মেয়েটি একটু বাঁকা হাসিয়া উত্তর করিল, “বলি, এই মুরদ লইয়া তুমি আমার বাবার সঙ্গে যুদ্ধ করিতে আসিয়াছ! ওটা দিয়া আমার বাবা দাঁত খেলাল করেন।এই বলিয়া খিলখিল করিয়া হাসিয়া, মেয়েটি শব্দ করিয়া দরজা বন্ধ করিয়া দিল। দরজায় শব্দ করিল না, যেন তার বুকের মধ্যেই হাতুড়ি দিয়া ঘা মারিল। রাগে অপমানে বাইশ-মণ-পালোয়ান অনেকক্ষণ দাঁড়াইয়া রহিল। | এতদূর আসিয়াও তেইশ-মণ-পালোয়ানের দেখা পাওয়া গেল। বহুকাল পরে একজন মনের মতো মানুষ পাওয়া গিয়াছিল, যার সঙ্গে সত্য সত্যই লড়াই করা যাইত। বনের বাঘ-ভালুকটা, সে মশা-মাছির শামিল হইয়া গিয়াছে ; – ধর আর মার। বেশ মনের মতো যুদ্ধ করা যায়, এমন একজন প্রতিযোগী তার ভাগ্যে জুটিয়াও জুটিল না। মনের দুঃখে বাইশ-মণ-পালোয়ান বাড়ি ফিরিয়া চলিল। চলিতে চলিতে সে এক মাঠের মধ্যে আসিয়া পড়িল। প্রকাণ্ড মাঠ। একধার হইতে আর একধার দেখা যায় না। হঠাৎ মাঠের মধ্যে ভূমিকম্পের মতো পায়ের তলার মাটি কাঁপিতে লাগিল। বাইশ-মণ-পালোয়ান মাঠের চাষীদের জিজ্ঞাসা করিল, “এত ভূমিকম্প কিসের ?" চাষীরা বলিল, “তাও জান না? তেইশ-মণ-পালোয়ান আরঙ্গাবাদের যুদ্ধ জয় করিয়া বাড়ি ফিরিতেছে। তার পায়ের দাপটে মাঠের মাটি কাঁপিতেছে। ওই যে সামনে পাহাড়ের মতো দেখা যাইতেছে না ? ওই তেইশ-মণ-পালোয়ান!”

বাইশ-মণ-পালোয়ান তখন তার পরনের কাপড়খানা মালকোচা করিয়া পরিয়া বুকে তাল ঠুকিয়া তেইশ-মণ পালোয়ানের সামনে গিয়া দাঁড়াইল। তেইশ-মণ-পালোয়ান জিজ্ঞাসা করিল, “তুমি কে?” আকাশ হইতে যেন বাজ পড়িল।

বাইশ-মণ-পালোয়ান তেমনি জোরে উত্তর করিলআমি তোমার সঙ্গে লড়াই করিতে আসিয়াছি। আমার নাম শোন নাই ? আমি বাইশ-মণ-পালোয়ান।"

তখন বাইশ-মণ-পালোয়ান আর তেইশ-মণ-পালোয়ানে লাগিল লড়াই। এদিক হইতে তাল ঠুকিয়া বাইশ-মণ-পালোয়ান তেইশ-মণ-পালোয়ানের ঘাড়ে পড়ে, ওদিক হইতে তাল ঠুকিয়া তেইশ-মণ-পালোয়ান বাইশ-মন-পালোয়ানের ঘাড়ে পড়ে। যেন পাহাড়ের উপর পাহাড় যাইয়া আছাড় খায়, যেন মেঘে মেঘে কড়াৎ কড়াৎ শব্দ করে! কেহ কাহারও চাইতে কম না, ওকে ঠেলিয়া খানিক ওদিকে লইয়া যায় ; আবার একে ঠেলিয়া খানিক এদিকে লইয়া আসে। তাহাদের ঠেলাঠেলির চোটে চারিদিকের মাটি আকাশ থরথর করিয়া কাঁপিতে লাগিল। হিমগিরির তিন চারিটি চূড়া ভাঙিয়া পড়িল। | এদিকে হইয়াছে কি ? না এক বুড়ি তার সোয়া লক্ষ ছাগল মাঠে চরাইয়া ঘরে ফিরিতেছিল। ছাগলগুলি লাইন ধরিয়া বুড়ির সঙ্গে সঙ্গে চলিতেছিল কিন্তু বাইশ-মণ-পালোয়ান আর তেইশমণ-পালোয়ানের লাফালাফিতে বুড়ির ছাগলগুলি ছড়াইয়া গড়াইয়া এলোমেলো হইয়া পড়িল। দু'চারটি তাহাদের পায়ের চাপে একেবারে চিড়ে চ্যাপ্টা। বুড়ি তাড়াতাড়ি সেই সোয়া লক্ষ ছাগল একটা একটা করিয়া তার ঝুলির মধ্যে পুরিয়া ফেলিল। আর বাইশ-মন-পালোয়ানকে তার এক কাঁধের উপর খাড়া করিয়া দিয়া, তেইশ-মণ-পালোয়ানকে অন্য কাধের উপর উঠাইয়া দিল। তারপর বুড়ি তার লাঠিতে ভর করিয়া আধার্বাকা হইয়া ঘরের দিকে ফিরিতে লাগিল। বাইশ-মণ-পালোয়ান আর তেইশ-মণ-পালোয়ান তার কাঁধের উপর দাড়াইয়া সমানে লড়াই করিতে লাগিল। এক লাফ দিয়া কাঁধে গিয়া ঝাপাইয়া পড়ে; এক লাফ দিয়া কাঁধে আসিয়া ঝাপাইয়া পড়ে। কেহ কাহারও চাইতে কম যায় না।  এদিকে হইয়াছে কি ? নাএক চিল বুড়ির ছাগলগুলির লোভে তাহার মাথার উপর দিয়া আকাশে ঘুরিতেছিল। সে এক ছে। মারিয়া সোয়া লক্ষ ছাগল অর কাধের উপর দুই পালোয়ানসুদ্ধ বুড়িকে আকাশে উড়াইয়া লইয়া গেল।

সে দেশের রাজকন্যা স্নানের পর ভিজা চুল এলাইয়া দিয়া ছাদের উপর রোদ পোহাইতেছিল। হঠাৎ চিলের ছোঁ হইতে সটকাইয়া গিয়া সেই ছাগল, পালোয়ান সমেত বুড়ি, রাজকন্যার চোখের মধ্যে গিয়া পড়িল। অমনি রাজকন্যা, “চোখে কি গেল, চোখে কি গেল" বলিয়া চিৎকার করিয়া উঠিল। রাজকন্যার সখীরা দৌড়াইয়া আসিল।

কত চক মকি, ঝকমকি, ঠকঠকি পাথরের রোশনাই জ্বালাইয়া, রাজকন্যার চোখটিকে রগড়াইয়া রগড়াইয়া তাহারা দেখিতে লাগিল। কিন্তু রাজকন্যার চোখের মধ্যে কোথাও তারা কিছু খুঁজিয়া পাইল না। খবর পাইয়া রাজা আসিলেন। মন্ত্রীকোটাল পাত্র-মিত্র হাওলাদার, পাখাবারদার, সকলে আসিল। রাজবৈদ্য তার জড়িবড়ি ওষুধের পাটা ঘষিতে ঘষিতে আসিলেন। তার পাহাড়ের আতশি পাথরের রোশনাই জ্বালিয়া, চোখের মধ্যে একশ নিরানব্বইটি দূরবিন সাজাইয়া, রাজবৈদ্য কত যে খুঁজিলেন, কিন্তু রাজকন্যার চোখের মধ্যে কোথাও কিছু দেখিতে পাইলেন না। রাজকন্যা শুধু কাঁদিতেছে, “চোখ জলে গেল, চোখ জ্বলে গেল।  তখন রাজা, পাত্র-মিত্র, হাওলাদার, সুবেদার, পাঙখবরদার, রাজবৈদ্য সকলে মিলিয়া পরামর্শ করিয়া স্থির করিলেন, জলধর জেলেকে ডাকিয়া আনিয়া রাজকন্যার চোখের মধ্যে বেড়াজাল ফেলা হউক। যদি কোথাও কিছু ঢুকিয়া থাকে সেই বেড়াজালের টানে বাহির হইয়া আসিবে। অমনি রাজকোতোয়ালের প্রতি হুকুম হইল জলধর জেলেকে ডাকিয়া আনিতে।

রাজার হুকুম,—ধরিয়া আনিতে বলিলে বাঁধিয়া আনেবাঁধিয়া আনিতে বলিলে মারিয়া আনে, আর মারিয়া আনিতে বলিলে ছাড়িয়া দিয়া আনে।

সিপাই-সান্ত্রী লইয়া রাজ-কোতোয়াল ঢুকিল জেলে-পাড়ায় জেলেদের ঘরের দরজা ভাঙিয়া চালের ছাউনি উড়াইয়া দিয়া, জালের সুতা এলোমেলো করিয়া দিয়া, রাজ-সৈন্যেরা একেবারে একাকার কাণ্ড করিয়া তুলিল। তবু জলধর জেলের সাড়াশব্দ নাই। ভয়ে সে মাছের খালুয়ের মধ্যে ঢুকিয়া থরথর করিয়া কাঁপিতেছে।

অনেকক্ষণ পরে যখন দেখিল আর লুকাইয়া থাকিলে জেলেপাড়া তন হইয়া যাইবে ; জালের দড়ি ধসন হইয়া যাইবে, তখন সে জোড়হাতে রাজ-কোতোয়ালের সামনে আসিয়া দাঁড়াইল।।

রাজ-কোতোয়াল সদম্ভে তাহাকে রাজার আদেশ জানাইয়া দিল। রাজার আদেশ শুনিয়া জলধর জেলের ধড়ে প্রাণ ফিরিয়া আসিল। সে তার সোয়া লক্ষ নাতিপুতি লইয়া, জাল-দড়ি-বাঁশ মাথায় করিয়া রাজপুরীতে আসিয়া হাজির হইল। | রাজার আদেশে জেলে তখন রাজকন্যার চোখের মধ্যে বেড়াজাল ফেলিয়া সোয়া লক্ষ নাতিপুতি লইয়া টানিতে লাগিল।

তাহারা জাল টানিয়া এদিক হইতে ওদিকে লইয়া যায় ; আবার ওদিক হইতে এদিকে টানিয়া লইয়া আসে; কিন্তু কোথাও কিছু জালে ঠেকে না।

দিন চলিয়া গেল, রাত হইল, রাত কাটিয়া গেল, আবার দিন আসিল। এমনি করিয়া সাত দিন সাত রাত কাটিয়া গেল। টানিতে টানিতে, রাজকন্যার চোখের পুবকোণে কি যেন একটা ঠেকিল।

সোয়া লক্ষ নাতিপুতি মিলিয়া জলধর জেলে আর পারে না ; – “হেইও জোয়ান হেইও, হেইও জোয়ান হেইও |” টানিতে টানিতে অনেক কষ্টে তাহারা জালটাকে টানিয়া আনিয়া কিনারায় জড়ো করিল! তখন আতশি পাথরের রোশনাই জালিয়া সোয়া লক্ষ দূরবিন লাগাইয়া সোয়া লক্ষ নাতিপুতি লইয়া জলধর জেলে অবাক হইয়া দেখে, জালের এক কানিতে আটকা পড়িয়া আছে সেই বুড়ি, তার কাঁধের উপর বাইশ-মণ-পালোয়ান আর তেইশ-মণ-পালোয়ান তেমনি সমানে যুদ্ধ করিয়া চলিয়াছে।

তারা টেরও পায় নাই, ইতিমধ্যে যে এত কাণ্ড হইয়া গিয়াছে। বুড়ির ঝুলির মধ্যে সােয়া লক্ষ ছাগল তেমনি আগের মতোই জমা হইয়া আছে।

চোখের ভিতর হইতে কুটোটি বাহির হইয়া গেল। রাজকন্যা হাসিয়া কথা বলিলেন।

বল খােকাখুকুরা, কে সবচাইতে বড় দুই পালোয়ান, না বুড়ি, চিল, না কে ?

সমাপ্ত

 

 

 

 

 

No comments:

Post a Comment

পাথর

  ---হুমায়ুন আহমদ পাথর “ চিত্রা মা , চা - টা উপরে দিয়ে আয়তাে। ' চিত্রা বারান্দায় বসে নখ কাটছিল। বাঁ হাতের কড়ে আঙ্গুলের...