টুনটুনি
আর টুনটুনা একসঙ্গে ত আছে। সেদিন
টুনটুনি। টুনটুনাকে বলে, “দেখ টুনটুনা! আমার যে বড় পিঠা
খাইতে ইচ্ছা করিতেছে।”
টুনটুনা
বলে, “পিঠা তৈরি করিতে চাউল লাগে, চেঁকি লাগে হাঁড়ি-পাতিল লাগে, কাঠ লাগে আরও কত কি লাগে।
এসব আমরা কোথায় পাইব ?"
টুনটুনি
বলে, “চল, আমরা গেরস্তের বাড়ি হইতে আগে চাউল টুকাইয়া আনি। তারপর আর সব জিনিসের
কথা চিন্তা করা যাইবে।” | টুনটুনি আর টুনটুনা ফুরুৎ
ফুরুৎ করিয়া উড়িয়া এ বাড়ি যায়
ও বাড়ি যায়। ছেলেরা এখানে সেখানে কত চাউল ছড়াইয়া
ফেলে। সেই চাউল ওরা টুকাইয়া লইয়া আসে।
তখন
টুনটুনা বলে, “চাউলের ত জোগাড় হইল।
এবার চাউল ভানিয়া গুঁড়া করিব কেমন করিয়া ?” টুনটুনা
তখন করিল কি? যাইয়া দেখে, গেরস্তের বউ ও-ঘর
হইতে চেঁকিঘরে যাইতেছে ! সে উঠানে একঘটি
পানি ঢালিয়া দিয়া তার পথ পিছল করিয়া
দিয়া আসিল। গেরস্তের বউ সেই পথ
দিয়া যাইতে আছাড় খাইয়া পড়িল। টুনটুনা এই অবসরে টেকি
ঘরে যাইয়া টেকির ললাটে চাউল ভরিয়া ধাপুর ধােপর পার । অল্পক্ষণের মধ্যে
চাউল গুঁড়া করিয়া তাহারা বাসায় ফিরিল ।
কিন্তু
পিঠা বানাইতে ত খাপরার দরকার।
খাপরা তারা কোথায় পাইবে ? এক কুমার, হাঁড়ি-পাতিল মাথায় করিয়া বাজারে যাইতেছিল । টুনটুনি করিল
কি ? তার পথের সামনে এক বদনা পানি
ঢালিয়া সেই পথ পিছল করিয়া
দিয়া আসিল। কুমার সেই পথ দিয়া যাইতেছে
অমনি ধপাস করিয়া আছাড় খাইয়া পড়িয়া গেল। মাথার হাঁড়ি-পাতিল মুড়মুড় করিয়া ভাঙিয়া গেল। মনের ইচ্ছামতাে টুনটুনি সেখান হইতে খাপরা টুকাইয়া আনিল।
পিঠা
বানানাের গুড়া হইল, খাপরা হইল; কিন্তু কাঠ পাইবে কোথায় ? টুনটুনি আর টুনটুনা এ
জঙ্গল ছাড়িয়া ও জঙ্গল পার
হইয়া জনমানুষের সাড়া মেলে না, এমন এক বিন্ধাবন জঙ্গলে
যাইয়া উপস্থিত হইল। সেখানে যাইয়া তারা দেখে গাছের উপর কত মরা ডাল
শুকাইয়া খড়ি হইয়া আছে। টুনটুনি আর টুনটুনা এ
ডাল ভাঙে মড়র মড়র, ও ডাল ভাঙে
কড়র কড়র, সে ডাল ভাঙে
চড়র চড়র। এমন সময় এক সিংহ, “হালুম
মালুম খেলুম” বলিয়া ডাক ছাড়ে, “এই বনে লাকড়ি
ভাঙে কারা?”
ভয়ে
টুনটুনি জড় সড়
কাঁপিতে
কাঁপিতে টুনটুনা পড় পড়।
সিংহ
আবার গর্জন করিয়া বলে, “এই বনে লাকড়ি
ভাঙে কারা ?” টুনটুনি
আর টুনটুনা অনেক সাহস করিয়া বলে।
“আমি
টুনটুনি মামা!
আমি
টুনটুনা মামা।
তােমাকে
দাওয়াত করিতে আসিয়াছি। আজ আমাদের বাড়িতে
চিতই পিঠা করিব কিনা, তাই তােমাকে বিকালে আমাদের বাড়ি যাইতে হইবে।”
একগাল
হাসিয়া সিংহমামা বলে, “বেশ ভাগনে! বেশ। বেশ ভাগনী! বেশ! তােমাদের দাওয়াত কি না রাখিয়া
পারা যায় ? আমি ঠিক সময়ে যাইয়া হাজির হইব।” সাহস পাইয়া টুনটুনি বলে, “তা মামা! আমরা
ত খুব ছােট, কয়টা লাকড়ি আর ঠোটে করিয়া
লইয়া যাইতে পারিব!” সিংহ
আর একটু হাসিয়া বলিল, “তবে দাঁড়া, আমি পিঠে করিয়া তােদের লাকড়ি দিয়া আসিতেছি।" এদিকে থাবা মারিয়া, ওদিকে থাবা মারিয়া মড় মড় করিয়া অনেক লাকড়ি ভাঙিয়া সিংহ পিঠে বােঝাই করিল। টুনটুনি আর টুনটুনা আগে
আগে পথ দেখাইয়া চলিল।
টুনটুনিদের বাসার সামনে আসিয়া দুড়ুম করিয়া পিঠের বােঝা নামাইয়া সিংহ চলিয়া গেল। যাইবার সময় বলিয়া গেল, “আজ ঠিক বিকাল
হইলে আমি পিঠা খাইতে আসিব।”
টুনটুনি
আর টুনটুনা পিঠা বানায়। একখানা বানায় টুনটুনি খায়, আর একখানা বানায়
টুনটুনা খায়। খাইতে খাইতে খাইতে তারা সকল পিঠা খাইয়া ফেলিল।
তখন
টুনটুনি বলে, “দেখ টুনটুনা! সব পিঠা ত
আমরাই খাইয়া ফেলিলাম। এদিকে সিংহ মামা আসিলে কি খাইতে দিব?"
দুইজনে
মিলিয়া অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া তাহারা করিল কি? মাঠ হইতে শুকনা গােবর আনিয়া এক প্রকাণ্ড ভুরী
বানাইল। তার উপরে একখানা পিঠা সাজাইয়া সমস্ত গােবর ঢাকিয়া ফেলিল। তারপর দুইজনে চাউলের হাঁড়ির মধ্যে লুকাইয়া সিংহমামার আসার অপেক্ষা করিতে লাগিল।
সিংহ
আসিয়া পিঠার ভুরী দেখিয়া বড়ই খুশি। পিঠার ভুরীর চারদিকে সে ঘােরে, একখানা
পিঠা তুলিয়া মুখে দেয় আর নাচিয়া নাচিয়া
গান গায়—
“টুনটুনিরে
পাইতাম,
ঘাড়ে
করে নাচতাম।"
এইভাবে
খাইতে খাইতে উপরের পিঠাগুলি সব ফুরাইয়া গেল।
তারপর একখানা গােবরের পিঠা মুখে দিয়া ওয়াক ওয়াক করিয়া ফেলিয়া দিল। তখন সিংহ মহাশয় তর্জন গর্জন করিয়া উঠিল,
“টুনটুনিরে
পাইতাম,
ঘাড়
মটকায়ে খাইতাম।
টুনটুনারে
পাইতাম,
ঘাড়
মটকায়ে খাইতাম।”
চাউলের
হাঁড়ির মধ্যে থাকিয়া টুনটুনা বলে, “টুনটুনিরে । আমার বড়ই
হচ্চো পাইয়াছে।”
টুনটুনি
বলে, “টুনটুনা সর্বনাশ করিলি! হঁাচ্চো দিলেই সিংহ টের পাইবে। আর টের পাইলে
আমাদের কি আর আস্ত
রাখিবে!”
এমন
সময় সিংহ গর্জন করিয়া বলিতেছে,
“টুনটুনারে
পাইতাম,
ঘাড়
মটকায়ে খাইতাম।
টুনটুনিরে
পাইতাম,
ঘাড়
মটকায়ে খাইতাম।”
কিন্তু
টুনটুনা বলে, “টুনটুনিরে! আমি যে আর থাকিতে
পারিতেছি না। আমার এমন হচ্চো পাইয়াছে।” টুনটুনি তার বুকে মাথায় পাখা ঘষে, পিঠে লেজে ঠোট ঘষে, “টুনটুনারে! আর একটু থামিয়া
থাক। | কিন্তু বলিলে কি হইবে! আকাশ
ফাটাইয়া টুনটুনা শব্দ করিল, “হাচ্চো।”
সেই
শব্দের জোরে চাউলের হাঁড়ি ভাঙিয়া ফটুট্টাস, আর ভয়ে লেজ
গুটাইয়া সিংহ মশায় দে চম্পট।
No comments:
Post a Comment